History

বদলে বদলে চলতে থাকা বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়

                       নিজেকে বদলে বদলে চলতে না পারলে যে পিছিয়ে পড়তে হয় বা চিরতরের মতো হারিয়ে যেতে হয়– একথা প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই সত্য। দক্ষিন দিনাজপুর জেলার বংশীহাড়ী ব্লকের বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয় বীজমন্ত্রের মতো একথা জপ করতে করতে দুরন্ত গতিতে এগিয়ে চলেছে। ১৯৬০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় আজ কেবল দক্ষিন দিনাজপুর জেলা নয়, পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়া, সংস্কৃতি এবং সর্বোপরি পঠনপাঠনের মানচিত্রে এক উজ্জ্বল নাম। এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী স্বর্গীয় শ্রী হরিপদ বসুর দানের জমিতে গড়ে ওঠা এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আজ সর্বক্ষেত্রেই প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সদা প্রস্তুত এবং সদা আগ্রহী। সাফল্যব্যর্থতা নিস্পৃহভাবে মেনে চলার শিক্ষা এবং সাফল্য-ব্যর্থতাকে সাথে নিয়েই একসাথে পথ চলার শিক্ষা এই বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের পাথেয়। স্বাভাবিকভাবেই অনেক স্তর পার করে আজ কখনও মৃদু, কখনও দৃঢ় পদক্ষেপ ফেলতে ফেলতে আজকের পর্যায়ে উন্নীত হতে এই বিদ্যালয়ের অনেক বছর লেগে গেছে। ১৯৬৮ সালে মধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়  বিদ্যালয়টি।বর্তমানে জেলার মেধাতালিকায় স্থান করে নেওয়া থেকে শুরু করে ছাত্রছাত্রীদের পাশের হার সবক্ষেত্রেই বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সুনাম আছে। কিন্তু বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় বিদ্যালয়ের উচ্চমাধ্যমিক ফলাফলের কথা। ২০০৩ সালে বিদ্যালয় উচ্চমাধ্যমিকস্তরে উন্নীত হয়। বর্তমানে উচ্চমাধ্যমিকে ধারাবাহিকভাবে ছাত্রছাত্রীদের নজরকারা সাফল্য প্রত্যন্ত গ্রামের এই বিদ্যালয়ের মান উত্তোরত্তর বৃদ্ধি করছে। নব্বই শতাংশের উপর নম্বর পেয়ে বহু কৃতী ছাত্রী প্রতিবছর নার্সিং প্রশিক্ষনের সুযোগ পায়। এদের মধ্যে অনেকেই আজ এই সেবামূলক মহত্রী পেশায় সফলভাবে কর্মরত। শ্রীমান পার্থ সরকারের নাম অবশ্যই উল্লেখ্য এই বিষয়ে। পার্থ ৯৫% নম্বর পেয়ে রায়গঞ্জ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরাজী সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা করা কালীন সেবার ডাকে ছুটে গিয়ে আজ অশোকনগর নার্সিং প্রশিক্ষনকেন্দ্রে প্রশিক্ষনরত।

                        এছাড়া বিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রীর “সকলের তরে সকলে আমরা”-এর শিক্ষা মজ্জাগত।  বিদ্যালয়ের কারিগরি শিক্ষাবিভাগে (Vocational Department) বহু ছাত্রছাত্রী পাঠরত এবং অনেকেই কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। সাংস্কৃতিক চর্চার কথা আজ সর্বজনবিদিত এবং সর্বস্তরে চর্চার বিষয়। সারাবছর ধরে চলা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে থাকা ছাত্রছাত্রীরা প্রতিবছর ব্লক, মহকুমা, জেলা এবং রাজ্যস্তরের প্রতিযোগিতায় বিদ্যালয়ের সংস্কৃতি- ধ্বজা সাফল্যের সাথে বহন করে। বিদ্যালয়ের বহু সাফল্য আজ বদলপুর এলাকাবাসীর শ্লাঘার বিষয়। ২০১৬ সালে নেতাজীর মহানিস্ক্রমনের ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে রাজ্যসরকার দ্বারা আয়জিত অনুষ্ঠানে বিতর্ক এবং প্রবন্ধ বিভাগে বিদ্যালয়ের ছাত্রী মনীষা গুহ, তনুশ্রী দত্ত মজুমদার এবং পায়েল রায় বিদ্যালয়ের জন্য কুড়িয়ে আনে অযুত প্রশংসা। ক্রীড়াক্ষেত্রেও রয়েছে বিদ্যালয়ের বহু বেনজির সাফল্য। ক্রীড়া শিক্ষকদের সারাবছর ধরে নিরলস প্রচেষ্টায় সাবডিভিশন, জেলা ও রাজ্যস্তরে বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা আজ সমীহ আদায় করতে সক্ষম। ২০১৯ সালে রাজ্যস্তরে খেলে বিদ্যালয়ের কবাডি দল। বিদ্যালয়য়ের কন্যারত্ন কত যে পালক এনে বিদ্যালয়ের মুকুট শোভায়িত করেছে তার ইয়াত্তা নেই। সারাবছর প্রস্তুতি নেয় বিদ্যালয়ের মহিলা ফুটবল দল। ২০১৮ সালে সুব্রত মুখার্জী কাপে রাজ্যস্তরে দাপিয়ে খেলে আসে বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীরা। ছাত্র অমিয় রায় একাধিক বার হাইজাম্প বিভাগে বিদ্যালয়কে এনে দেয় পুরস্কার। থ্রোয়িং ইভেন্টে প্রনব বিশ্বাস আরেকজন কৃতী খেলোয়াড়। বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের দুষ্প্রাপ্য বইয়ের সংগ্রহ ইর্ষাযোগ্য।  বইপ্রিয় গ্রন্থাগারিক ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছেন বইয়ের প্রতি ভালবাসা। CSS-VSE -এর NSQF স্কীমের অর্ন্তগত Information Technology (IT/ITES) এর Computer Lab ও Automobile Sector -এ ছাত্রছাত্রীদের আধুনিক প্রযুক্তিতে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পীঠস্থান বিদ্যালয়ের অডিটরিয়াম বিদ্যাসাগর কক্ষ। গতবছর ২৬শে সেপ্টেম্বর বিদ্যাসাগর মহাশয়ের জন্মবার্ষিকীতে তাঁর নামে কক্ষটি উৎসর্গীকৃত করা হয়। বিদ্যালয়ের নিজস্ব সব্জিবাগান, ফুলের বাগান মনোহরা। ছাত্রছাত্রীদের সাইকেল নিরাপদভাবে সুসজ্জিত করে রাখার জন্য রয়েছে প্রশস্ত সাইকেল স্ট্যান্ড। শিশু সুরক্ষার বিষয়টি বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ন তা বোঝা যায় বিদ্যালয়ের তরফ থেকে নেওয়া একটা সময়োপযগী পদক্ষেপে। ২০১৭ সাল থেকেই বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ, বিদ্যালয় ক্যাম্পাস সিসিটিভি ক্যামেরার নজরাধীন। গ্রামের জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী ছাত্রছাত্রীদের সুন্দর, সুস্থ দেহ ধরে রাখার জন্য বিদ্যালয়ে রয়েছে আধুনিক মানের মাল্টিজিম। শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয় শিক্ষক-শিক্ষাকর্মীদেরও এই জিমে আনাগোনা চোখে পড়ার মতো। মধ্যাহ্নকালীন আহার গ্রহণের জন্য রয়েছে ৫০০ জন বসে খাবার মতো ডাইনিং হল। হলটিতে বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবস্থা আছে পর্যাপ্তভাবে। স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় চূড়ান্তভাবে। বিশেষকরে ছাত্রীদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্যবিধি সুনিশ্চিত করার জন্য বসেছে Vending Machine সম্পূর্ন বিনামূল্যে। পরিশ্রুত পানীয় জলের জন্য আছে ফিল্টার। ছাত্রছাত্রীরা নিরবিচ্চিন্নভাবে এই জল সংগ্রহ করে। অবিভাবক অবিভাবিকাগন এই বিদ্যালয়  নিয়ে গর্ব করেন। প্রশাসনিক কর্তারা বিদ্যালয়ে এসে মুগ্ধ হয়ে যান। এইগুলিই বিদ্যালয়ের কাছে সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার। তবুও স্বীকৃতি পেলে কার না ভালো লাগে! ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক-শিক্ষিকা, শিক্ষাকর্মী, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, এলাকার শিক্ষাদরদী অবিভাবক অবিভাবিকা সকলের প্রচেষ্টায় চলতে থাকা এই বিদ্যালয় ২০১৭ সালে নির্মল বিদ্যালয় পুরস্কারে ভূষিত হয়। ঠিক পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮ সালে কলকাতায় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে রাজ্যসরকার দ্বারা পুরস্কৃত হয় শিশুমিত্র পুরস্কারে।

                       ছাত্র আসে, ছাত্র যায়, বয়ে চলে ছাত্রধারা। তবু প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের সাথে ছেড়ে না নাড়ীর টান। এর প্রমান প্রতিবছর বিদ্যালয়ের বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং ক্রীড়ানুষ্ঠান এবং সরস্বতী পূজায় প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের ভিড় এবং বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের সাথে স্বতঃপ্রনোদিত হয়ে দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে ঐ অনুষ্ঠানগুলিকে সাফল্যমণ্ডিত করার আপ্রান চেষ্টা বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের অতীত, বর্তমান এবং ভালবাসার এই ছবির বদল চায় না বদলে বদলে চলতে চলতে নিজেকে ক্রমাগত পরিবর্ধন এবং পরিমার্জন করতে থাকা বদলপুর উচ্চ বিদ্যালয়।