History

'গোবিন্দপুর দ্বারিকানাথ ইনস্টিটিউশন' - পথচলা

           স্বাধীনতার পর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। শিক্ষার আলো প্রজ্জ্বলিত হয়নি দেশের সর্বত্র। ছিটেফোঁটা জ্ঞানের আলো জ্বলছে এদিকে ওদিকে। শহরে বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠিত হলেও গ্রামগুলো শিক্ষা থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। এই প্রতিকূলতা কে কাটিয়ে গ্রামে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছে হাতেগোনা কয়েকজন মাত্র। শহর থেকে প্রায় চার কিলোমিটার দূরে বাবলা অঞ্চল তখনও শিক্ষার অন্ধকারে নিমজ্জিত। কোন সরকারি কাগজপত্র এলে ছুটে যেতে হয় ঘোষ কিংবা হালদার পরিবারের কাছে। ইচ্ছা থাকলেও পায়ে হেঁটে চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে পৌঁছানো ছাত্রের সংখ্যা খুবই নগণ্য। যাতাযাতের সুবিধাও তেমন ভাবে ছিল না। একমাত্র মাধ্যম সাইকেল, সেটা ক্রয় করাও সকলের সাধ্যের বাইরে। আর মেয়েরা তো শিক্ষা থেকে বহুদূরে অন্ধকারে আবদ্ধ। শিক্ষা ছাড়া সুষ্ঠু ও সুন্দর সমাজ গঠক করা সম্ভব নয়। একটা গাছ মাটিতে পুঁতলে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে সূর্যের দিকে মুখ তুলে তাকায়। নিজের সর্বস্ব উজাড় করে ফুলে ফলে ভরিয়ে দেয়। বিশাল বটবৃক্ষের ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করে হাজার হাজার মানুষ। গাছকে আস্রয় করে বেঁচে থাকে পাখি, কীটপতঙ্গ।

এলাকার ছেলে-মেয়েদের শিক্ষার কথা মাথায় রেখে এলাকার কিছু শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মিলিত হয়েছিল মুক্ত আঙ্গিনায়। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিতাই চাঁদ ঘোষ, সুধাংশু বিশ্বাস, নির্মল ঘোষ, বাগদেবী ঘোষ, নারায়ণ বিকাশ সিংহ রায়, আশুতোষ ভাদুড়ি, গোবিন্দ সরকার, লক্ষ্মী নারায়ণ ঘোষ, বিপ্লব বাগচী প্রমুখ। নিজেদের প্রয়োজনের তাগিদে সকলের সম্মতিতে বাবলা অঞ্চল এলাকায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সিদ্ধান্ত নিলেই হবে না বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার জন্য প্রয়োজন মুক্ত জমি। আলোচনা সভায় উপস্থিত সহৃদয় বান ব্যক্তি ঘোষ পরিবারের প্রধান নিতাই চাঁদ ঘোষ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য জমি দানে সম্মতি জানায়। সকলে আশায় বুক বাঁধে। গ্রামের আপামর জনসাধারণের ঐকান্তিক সহযোগিতায় ১৯৭০ সালের ২ রা জানুয়ারী পাশ্ববর্তী প্রাথমিক স্কুলের বারান্দায় আনুষ্ঠানিক ভাবে বিদ্যালয় স্থাপিত হয় এবং পাঠদান শুরু হয়। পরবর্তীতে বাবলা গ্রাম নিবাসী শ্রী নিতাই চাঁদ ঘোষ মহাশয়ের দানকৃত  জমিতে বিদ্যালয়ের কাঁচা বাড়ি নির্মাণ করে বিদ্যালয় চলতে থাকে। কেউ বাঁশ, কেউ টালি দিতেও সম্মতি জানায়। শুরু হল পথ চলা। খেজুরের পাতার পাটি, উপরে টালির চালা। মুড়লি চটার বেড়া। বাঁশের মাচা হাই-বেঞ্চ হিসাবে ব্যবহৃত হত। জলের সুব্যবস্থা ও ছিল না। স্ট্যান্ড দেওয়া ব্ল্যাক বোর্ড। সেই সদ্য প্রস্ফুটিত হওয়া কুঁড়িটি একটু একটু করে বিকশিত হতে শুরু করেছে। তখনও সরকারি অনুমোদন মেলেনি। বেগারশ্রম আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের জোগান মিটিয়ে ক্লাসের সংখ্যা বৃদ্ধি হচ্ছে। তারপর কেটে গেছে অনেকগুলো বছর। ছুটাছুটি শুরু হয়েছে সরকারি দপ্তরে। মিলেছে সরকারী অনুমোদন ১৯৮৪ সালে। নিতাই চাঁদ ঘোষ মহাশয়ের প্রপিতামহ স্বর্গীয় দ্বারিকানাথ ঘোষের স্মরণে বিদ্যালয়ের নামকরণ হয়েছে ‘গোবিন্দপুর দ্বারিকানাথ ইনস্টিটিউশন’। বিদ্যালয় জুনিয়র বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। কিছু সরকারি সাহায্যও মেলে, শ্রেণী কক্ষের শ্রী বৃদ্ধি পায়। বাঁশের বেড়া, টালির চালের স্বপ্ন ইট পাথের শক্ত পোক্ত গৃহে রূপান্তরিত হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা, অনুমোদন ও অগ্রগতিতে সুকুমার ঘোষ (অবসরপ্রাপ্ত প্রঃ শি) এবং সহ শিক্ষক সাধন কুমার ঘোষের ভূমিকা তাৎপর্যপূর্ণ।

১৯৯৮ সালে জুনিয়র থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উওীর্ণ হয়। নবপল্লবে ধীরে ধীরে সুসজ্জিত হচ্ছে ছোট বিদ্যালয় আঙ্গিনা। ২০০৭ সাল থেকে অষ্টম শ্রেণী উত্তীর্ণ ছাত্র-ছাত্রীদের বৃওিমূলক প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ২০১৪ সাল বিদ্যালয় উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উওীর্ণ হয়। কলা বিভাগের বাংলা, ইংরাজী, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সংস্কৃত, শিক্ষাবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পথচলা শুরু। ২০২৩ সাল কলা বিভাগের আরও তিনটি বিষয় অনুমোদিত হয়েছে দর্শন, ভূগোল, পরিবেশবিদ্যা। পাশাপাশি সায়েন্স বিভাগ চালু করার জন্য কাউন্সিলের স্বীকৃতি পেয়েছে। আশা রাখছি ২০২৪ শিক্ষাবর্ষ থেকে বিদ্যালয়ে সায়েন্সের পঠনপাঠন শুরু হবে। আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে দেখা সুহৃদয়বান ব্যক্তিদের স্বপ্ন গুলো সত্যি হওয়ায় হাতছানি দিচ্ছে। শুধু দরকার এলাকার আপামোর জনগণের ঐকান্তিক সদিচ্ছা ও আন্তরিক ভালোবাসা। সকলের মিলিত প্রচেষ্টার দ্বারা সাফল্যের শিখরে উওীর্ণ হতে পারব এটা আমাদের সকলের আশা।