
সুলেখক ও গবেষক বিনয় ঘোষের "বিদ্যাসাগর ও বাঙালি সমাজ "গ্রন্থে দেখতে পাই, বিদ্যাসাগরের প্রপিতামহ ভুবনেশ্বর বিদ্যালঙ্কার পলাশীর যুদ্ধের সময় বনমালিপুর গ্রামে বাস করতেন। জাহানাবাদের ঈশান কোণে প্রায় তিন ক্রোশ দূরে বনমালিপুর গ্রাম। আরামবাগের অনতিদূরে এই গ্রাম এখনো আছে এই বনমালিপুর সম্বন্ধে বিদ্যাসাগর বলেছেন "উহাই আমার পিতৃপক্ষীয় পূর্বপুরুষদের বহুকালের বাসস্থান"।
এই উদ্ধৃতির কারণ অদ্যাপি কতিপয় মানুষের একটা দীর্ঘ বদ্ধভুল ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটানোর জন্য যে তারা বনমালিপুর গ্রামকে বিদ্যাসাগরের মাতুলালয় বলে মনে করে থাকেন । তবে বনমালিপুরের বিদ্যালঙ্কার ও বীরসিংহের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত উমাপতি তর্কসিদ্ধান্ত সমসাময়িক ।
বনমালিপুর গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তে তপশীল জাতি অধ্যুষিত এক পাড়ায় স্বর্গত রেনুপদ বাগ মহাশয় এর দান করা এক একর জমির উপর বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। পুরনো নথি অনুযায়ী 1954 খ্রিস্টাব্দে তৎকালীন সহকারী বদান্যতায় ও গ্রামের মানুষের যথাসাধ্য সাহায্য ও অকুণ্ঠ সহযোগিতায় ও ক্লান্তিহীন কায়িক প্রচেষ্টায় তৈরি হয়েছিল দক্ষিণ বনমালিপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। পরে খরের ছাউনির পরিবর্তে টিনের আচ্ছাদন চাপানো হয় । সেই সময়ে বন্যা একটি প্রায় বার্ষিক ঘটনায় পরিণত হয়েছিল। খুব নিচু জমিতে বিদ্যালয়টি পত্তন হওয়ায় বন্যার সময় বিদ্যালয় গৃহটি ডুবে থাকতো। 1947 সালের প্রবল বিধ্বংসী বন্যায় বিদ্যালয় গৃহটি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে । বন্যার জল সরে গেলে সেই ভেঙে পড়া ঘরের মধ্যেই কোনরকম ভাবে পড়াশোনা চলত। তখন প্রধান শিক্ষক মহাশয় এর পদে ছিলেন নিকটতম প্রতিবেশী গ্রামের স্বর্গত মহাদেব দাস মহাশয়। ভেঙে পড়া বিদ্যালয়টি পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন বোধ করে তিনি স্বয়ং সচেষ্ট হন ও গ্রামের সাধারণ মানুষের অনুরোধে তদানীন্তন হুগলি জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্ষদের তৎকালীন সভাপতি স্বর্গত শৈলধর ঘোষ মহাশয় এর কাছে আবেদন রাখেন ও তিনি তাদের সর্বাঙ্গীন উদ্যোগে সন্তুষ্ট হয়ে প্রধান শিক্ষক মহাশয় এর নামে 12 শতক জায়গা দানপত্র করে দেন । তখনকার সেই দারুন দিনে সরকারি আর্থিক অনুদানে এবং শ্রমজীবী মানুষগুলির ক্লান্তহীন কায়িক পরিশ্রমে ও যথাসাধ্য অর্থানুকূল্যে তিন কক্ষবিশিষ্ট পাকা বাড়ি নির্মিত হয় এবং সেখানে বিদ্যালয়টি আজও চলছে।
বর্তমানে বিদ্যালয়টির পরিকাঠামো অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। সর্বশিক্ষা মিশনের অতুলনীয় অনুদানে অতি সুন্দর নতুন ভবন নির্মিত হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের স্বতন্ত্র শৌচালয় তৈরি হয়েছে। পানীয় জলের জন্য কলের ব্যবস্থা হয়েছে। এই মুহূর্তে একজন শিক্ষিকা সহ মোট চারজন শিক্ষক-শিক্ষিকা আছেন। তারা সকলেই উদ্যোগী। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন প্রাক প্রাথমিক থেকে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা 46