
১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহের পর ধাপে ধাপে ভারতে সমাজ সংস্কার আন্দোলন ,ধর্ম সংস্কার আন্দোলন,অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য আন্দোলন ,রাজনৈতিক পুনরুদ্ধারে আন্দোলন ,শিল্প-সংস্কৃতি-শিক্ষার সংস্কার ও যুক্তিবাদী-বিজ্ঞান মনস্কতা গড়ে তোলার আন্দোলন ইত্যাদি আন্দোলন নানা সময়ে গড়ে উঠতে থাকে । ফলশ্রুতিতে,ঐ ১৮৫৭ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ।
এর ফলে বাংলায় শিক্ষাক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয় । এর সঙ্গে ১৮৮৪ সালে হান্টার কমিশনের রিপোর্ট ,যা প্রাথমিক শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করে । সেই সময় হাওড়ার তৎকালীন গ্রামীন এলাকা ,কোনা অঞ্চল ,যা বেনারস রোডের ধারে অবস্থিত ।যে বেনারস রোড ধরে বিদ্যাসাগর মহাশয় পায়ে হেঁটে কোলকাতা যাতায়াত করতেন । সেই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া মানুষ জনের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যম ছিল কেবল মাত্র পাঠশালা ও টোল ।শিবু ঘোষের বাড়িতে পঞ্চানন ঠাকুরের টোল ছিল ।তখনও এ অঞ্চলে আধুনিক শিক্ষার কোন কেন্দ্র গড়ে উঠেনি ।যুগের চাহিদা অনুযায়ী,আধুনিক শিক্ষার তাগিদ অনুভূত হয় ।
এই প্রেক্ষাপটে , ১৮৮৫ সালে কোন এক শুভ দিনে শ্রদ্ধেয় বলরাম মুখার্জী ,পঞ্চানন মুখার্জী ,শ্রীধর পাল মহাশয় দের উদ্যোগে বাগপাড়ার গুইরাম দাসের দালানে কয়েক জন ছাত্র নিয়ে ইংরাজী শেখার স্কুল চালু হয় । প্রায় দশ বছর পর এটি বিদ্যালয় হিসাবে সাংগঠনিক রূপ পায় (১৮৯৫) । বিদ্যালয় পরিচালন কমিটি গঠিত হয় ।প্রথম সভাপতি হন শ্রদ্ধেয় নিবারন চন্দ্র দে ও সম্পাদক হন শ্রদ্ধেয় শ্রীধর পাল (১৮৯৫-১৯০৫) । ১৯০৪ সাল নাগাদ প্রথম প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন শ্রদ্ধেয় শ্রী উপেন্দ্রনাথ পাটোয়ারী মহাশয় ।অতঃপর বিদ্যালয়ের প্রতি এই গ্রামের মানুষের আগ্রহ ও আকর্ষন বাড়তে থাকে ,বাড়তে থাকে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা ।
১৯১৮-২০ সাল নাগদ বিদ্যালয় টি ,বর্তমান স্থানে স্থানান্তরিত হয় এবং প্রথমে ছিটেবেড়া ,মাটির দেওয়াল ও গোলপাতার ছাউনি দেওয়া বিদ্যালয় ভবনে পড়াশুনা শুরু হয় । এর পর এলাকার ,উদ্যোগী ,দানবীর ,শিক্ষাব্রতী মানুষ জনের সহায়তায় বিদ্যালয়ের স্থায়ী নির্মান এর কাজ শুরু হয় । এ সময় কিছু দিনের জন্য এলাকার জর্জবাড়িতে বিদ্যালয়ের পঠন-পাঠন চলতে থাকে ।
১৯২০ সালে এলো সরকারী স্বীকৃতি ,চালু হলো চতুর্থ শ্রেণি । আর ১৯২১ সালে পঞ্চম ও ১৯২২ সালে ষষ্ঠ শ্রেণি । তখন বিদ্যালয়ের নামকরণ হয় “ কোনা মিডল ইংলিশ স্কুল “।
স্থানীয় অনেক শিক্ষানুরাগী মানুষের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও স্বেচ্ছাশ্রমের এবং শিক্ষকদের আন্তরিক শিক্ষা দানের মধ্য দিয়ে এই বিদ্যালয়ের সুনাম ক্রমে ক্রমে গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে আশে পাশের গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে ।
১৯৩৫ সালে উদযাপিত হয় বিদ্যালয়ের ৫০ বৎসর পূর্তি । গান,আবৃতি,খেলাধূলা,ব্রতচারী নৃত্য,স্কাউট ড্রিল প্রভৃতির মধ্য দিয়ে উৎসব পালিত হয় । এই বছরই ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটে,কিন্তু শ্রেণিকক্ষের অভাবের কারনে প্রাথমিক বিভাগ আলাদা হয়ে প্রাতঃকালীন বিভাগ হিসাবে চালু হয় ।যা কোনা সংযুক্ত প্রথমিক বিদ্যালয়্ হিসাবে ১৯৪৬ সালে সরকারী অনুমোদন পায় ।আর দিবা বিভাগ চলতে থাকে পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত কোনা জুনিয়র হাইস্কুল নামে ।যা ১৯৫২ সালে সরকারী অনুমোদন পায় ।ক্রমশ ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও, দূর্ভাগ্যের বিষয় এই ছিল যে ,কোন এক অজানা কারনে দীর্ঘদিন এ বিদ্যালয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নিত হতে পারেনি ।
১৯৮৫ সালের ২৪-২৬ শে মার্চ বিদ্যালয়ে সাড়ম্বরে শতবর্ষ উৎযাপিত হয় । শোভাযাত্র ,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ,নাটক ,ছায়াছবি প্রদর্শন প্রভৃতি ছিল অনুষ্ঠানের প্রধান অঙ্গ ।শপথ গৃহীত হয়,শতাব্দীর নিষ্কৃয়তার অভিশাপ থেকে মুক্ত করে বিদ্যালয় কে উচ্চ-বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করার ।ফলশ্রুতিতে ১৯৮৭ সালের ১ লা জানুয়ারী এ বিদ্যালয় মাধ্যমিক বিদ্যালয় রূপে WBBSE এর অনমোদন পায় ।ফলে কোনা অঞ্চলের ধনী-দরীদ্র সকল শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের দুরের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যাওয়ার কষ্ট থেকে মুক্তি ঘটে ।এ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়ীত্বে ছিলেন শ্রদ্ধেয় বাদল চন্দ্র দাস মহাশয় ।
এরপর শিক্ষার্থীর সংখ্যা গুণোত্তর প্রগতিতে বাড়তে থাকে ।ক্রমে মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফল পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে বিদ্যালয় গুলির তুলনায় যথেষ্ট কৃতিত্ব প্রদর্শণ করতে থাকে । এবার দাবী ওঠে, উচ্চতর বিদ্যলয়ের ।২০০৬ সালে WBCHSE থেকে উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অনুমোন পাওয়া যায় ।কেবল কলা বিভাগ নিয়ে পঠন-পাঠন শুরু হয় ।প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ মহাশয় ।
২০১০ সালে বিদ্যালয়ের ১২৫ বছর পূর্তি উৎসব আড়ম্বর সহকারে পালিত হয় ।প্রভাত ফেরী ,নানাবিধ সাংস্কৃতি অনুষ্ঠান্ ,বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের উপস্থিতি উৎসবে, অন্য মাত্রা যোগ করে ।
বিদ্যালয়ে উপযুক্ত সংখ্যক আগ্রহী ছাত্র-ছাত্রী ,শিক্ষক-শিক্ষিকাদের পাঠদানে আন্তরিক প্রচেষ্ঠা ,শিক্ষাকর্মীদের বিদ্যালয়ের প্রতি নিষ্ঠা ,এলাকার মানুষজনের বিভিন্ন ভাবে সহযোগিত্,এ বিদ্যালয়ের অগ্রগতির মুল ভিত ।তবে স্থানাভাব কোনা হাইস্কুলের সবচেয়ে বড় অভাব ।তবুও স্থানাভাবের প্রতিবন্ধকতা কাটিয়ে,স্থানীয় মানুষজনে আর্থিক সহায়তায় বিদ্যালয় কে চতুর্থতলে রূপান্তরিত করা হয় । বিজ্ঞান বিভাগের জন্য পরীক্ষাগার গুলি প্রস্তুত করা হয় । আধুনিক বিজ্ঞান ও বানিজ্যের ধারাকে এ বিদ্যালয়ে প্রবাহিত করতে ,২০১৫ সালে WBCHSE এর অনুমোদন ক্রমে বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান ও বানিজ্য বিভাগ চালু হয় ।যা এখন সাফল্যের স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে চলেছে ।এ সময় কালে প্রধান শিক্ষক শ্রদ্ধেয় প্রণব কুমার মাইতি মহাশয়(২০১১-…)।
শতবর্ষ প্রাচীন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠা গড়ে ওঠার পিছনে অসংখ্য শিক্ষাব্রতী ,দানবীর মানুষে অবদান জড়িয়ে আছে ,তাঁদের মধ্যে কয়েক জনের নাম উল্লেখ না করলে ,কোনা হাইস্কুলের ইতিকথা অসমাপ্ত থেকে যায় ।যেমন,শ্রদ্ধেয় চুনীলাল রায় (প্র.শি-১৯২৩-১৯৫৩),শ্রদ্ধেয় প্রবোধ রঞ্জন গুহঠাকুরতা(প্র.শি-১৯৫৮-১৯৮৩),শ্রদ্ধেয় নলিনী বিহারী দাস মহাপাত্র(সম্পাদক,সভাপতি-১৯৮৮-২০০১),শ্রদ্ধেয় দিলীপ চ্যাটার্জী (সম্পাদক-২০০১-০৮),শ্রদ্ধেয় তরুন কান্তি পল্ল্যে(সম্পাদক-২০১১-২০১৬),শ্রদ্ধেয় রামলাল চ্যাটার্জী(সমাজসেবী),ও আরো অনেকে ।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার সকল অঙ্গকে সংযুক্ত ও প্রাধান্য দিয়ে (যথা –ICT Project,Smart Class,Child & Activity centric Learning,CCTV etc.) শিক্ষার্থীদে প্রকৃত মানুষ তৈরী করার অঙ্গীকার নিয়ে এ বিদ্যালয় এগিয়ে চলেছে ।চলতে থাকবে ……………