
কালের সরণি ধরে অতীতের পথে চলতে থাকা ও তথ্য বিবৃত করা যদি ইতিহাস হয়... তাহলে এই বিবৃতিতে শুধুমাত্র একটি টাইমলাইনই যথেষ্ট হত। কিন্তু ইতিহাস যদি এক উপলব্ধি হয়... আর সে উপলব্ধির বিস্তার যদি এক শতাব্দীর অধিক হয়, তাহলে তা বালি জোড়া অশ্বত্থতলা বিদ্যালয়ের ইতিহাস হলেও হতে পরে। এই বিদ্যালয়ের ইতিহাস বলতে গেলে এক ভাবে প্রায় 100 বছরের বঙ্গদর্শনের অভিজ্ঞতার কথা বলা যাবে। নানা কারণে উঠে আসবে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শ্রী অরবিন্দ, স্বামী বিবেকানন্দ ও গান্ধীজীর প্রসঙ্গ। এই চার শিক্ষাব্রতী ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যে উচ্চতায় স্থাপনের স্বপ্ন দেখেছিলেন…. আমাদের বিদ্যালয়ের পুরোধা ত্রয়ী এদেরই পথ অনুসরণ করে এই প্রতিষ্ঠানকে এক উন্নততর পটভূমি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।
যদিও 1913 সালের 8ই মার্চ তৎকালীন হাওড়ার জেলা শাসক C. A. Radice এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে এই বিদ্যালয়ের সরকারী সূত্রপাত, কিন্তু জন্মের ভাবনা জন্মক্ষণের থেকেও জন্ম চেতনায় অধিক দৃঢ়তায় প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর সেই জন্মের সার্থকতা আজীবনের কর্মের উৎকর্ষতার মধ্যে নিহিত থাকে।
খালি চোখে এই বিদ্যালয়ের দিকে তাকালে এর তিনটি ভবন চোখে পড়ে। এই বিদ্যালয়ের প্রধান ভবন স্থানীয় শিক্ষানুরাগী শ্রী প্রবোধ চন্দ্র ঘোষ এর নামানুসারে প্রবোধ ভবন রাখা হয়। বালি ঘোষপাড়া নিবাসী এই ব্যক্তি বর্তমানের বিদ্যালয়টি নির্মাণের পুরোধা পুরুষ। আজ থেকে প্রায় দেড়শ বছর আগে এই অঞ্চলটি বন জঙ্গলে ও জলা জমিতে ভরা একটি অপ্রসিদ্ধ অঞ্চল ছিল। সেকালে ঠ্যাঙাড়েদের উৎপাত এর কারণে এই স্থানের নাম ছিল ঠ্যাঙাতলা। বালির গঙ্গার ধার নিবাসী অভিজাত পল্লীর মানুষেরা একে জলাপাড়া বা চাষাপাড়াও বলতেন। অঞ্চলটিতে অসামাজিক কার্যকলাপ বাড়তে থাকায় স্থানীয় ঘোষ পাড়া নিবাসী কিছু মানুষ অঞ্চল সংস্কারের মানসিকতায় এখানে একটি বারোয়ারি সমিতি গঠন করেন। এই সমিতি বর্তমানে যেখানে বালি বঙ্গ শিশু বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে সেখানে নিয়মিত কালী পূজার ব্যবস্থা করেন। এই বারোয়ারি সমিতির উদ্যোগে বারোয়ারি তলা সংলগ্ন অংশে একটি ছোট পাঠশালা গড়ে তোলা হয়। বাঁশের খুঁটি, ছাঁটাইয়ের দেওয়াল ও বাঁশের জাফরিকাটা ছোট্ট চালাঘরে খুবই সামান্য আয়োজনে শুরু হয় তখনকার বঙ্গ শিশু বিদ্যালয়।
মাত্র 4-5 জন শিক্ষার্থীকে নিয়ে বিদ্যালয়ের প্রথম গুরুমশাই শ্রী কিশোরীমোহন ভট্টাচার্য্য পাঠদান শুরু করেন। ভদ্রলোক বর্ধমানের মানুষ ছিলেন। দেশে ফেরার সময় তার ভাই শ্রী যুগল কিশোর ভট্টাচার্য কে এই কাজের দায়িত্ব দিয়ে যান। এই পর্যন্ত বিদ্যালয় যেমন তেমন করে চললেও এই অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। এর কিছুকাল পরে প্রবোধ চন্দ্র বাবু এই বিদ্যালয় কে পুনরুজ্জীবিত করার দায়িত্ব নেন এবং স্থানীয় শ্রী প্রমথনাথ চক্রবর্তীর সাথে পুনরায় বিদ্যালয়টিকে সক্রিয় করে তোলেন। এই পর্যায়ে শ্রী কৃষ্ণধন চক্রবর্তী ও শ্রী মন্মথ নাথ চক্রবর্তী এবং পরবর্তী পর্যায়ে শ্রী কালিপদ ঘোষ (ঘোষ পাড়া নিবাসী) ও শ্রী বনমালী পাত্র (কৃষ্ণ চ্যাটার্জী প্লেন নিবাসী) বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করেন। প্রমথ বাবু তার জীবদ্দশায় বিদ্যালয়ের সকল ব্যয়ভার নিজে বহন করেছিলেন। কিন্তু ছাত্র সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে স্থানের অকুলানের কারণে নিকটবর্তী শ্রী অমূল্যচরণ কর্মকার ও শ্রী রাজেন্দ্রনাথ পানের বাইরের ঘরটি বিদ্যালয়ের পঠন পাঠনের জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে।
এরইমধ্যে অঞ্চলের নাম বদল হয়েছে বেশ কয়েকবার। ঠ্যাঙাতলা থেকে সাতগাছিতলা হয়ে ততদিনে এই স্থানের নাম হয়ে গেছে জোড়া অশ্বত্থতলা।
ছাত্রসংখ্যা যখন আরো বাড়ে তখন বিদ্যালয়ের নিজস্ব গৃহের প্রয়োজন অনুভূত হয়। বারোয়ারি সমিতির সদস্যরা মিলিতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বারোয়ারী সমিতির জমি স্কুলকে দান করেন। সে এক যুগ ছিল যখন সাধারন মানুষ শিক্ষা এবং ধর্মকে তুলাদন্ড দুই পাশে সম মর্যাদা দিয়েছে। কমিউনিটি পার্টিসিপেশন যে কি অসাধ্য সাধন করতে পারে তা এই বিদ্যালয়ের সূচনা লগ্ন থেকে স্পষ্ট হয়ে যায়।
এই সময় বারোয়ারি সমিতির সদস্যগণ ছিলেন শ্রী ললিতমোহন মুখোপাধ্যায়( সম্পাদক), শ্রী অমূল্যচরণ কর্মকার, শ্রী অনন্তরাম ঘোষ, শ্রী ধর্মদাস ঘোষ, শ্রী দুর্গাচরণ নিয়োগী, শ্রী নিধিরাম পাল, শ্রী হারাধন ঘোষ, শ্রী নারায়ণ চন্দ্র ঘোষ, শ্রী সিদ্ধেশ্বর ঘোষ ও শ্রী প্রবোধ চন্দ্র ঘোষ। বারোয়ারি সমিতির দান করা এই পূজার জমিতেই বিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও স্থানীয় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় বঙ্গ শিশু বিদ্যালয়ের একতলা গৃহ নির্মাণ হয়। ললিত মোহন বাবুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় বালি মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান বর্তমান বামাচরণ ভবন ও বঙ্গ শিশু বিদ্যালয়ের অবশিষ্ট জমি পেতে সাহায্য করেন। তৎকালীন বালির ছ'আনার জমিদার দানপত্র করে এই জমি বিদ্যালয়কে দিয়ে যান।
বিদ্যালয় স্থাপনের পরবর্তী বেশ কিছু সময় ধরে প্রবোধ চন্দ্র বাবু গৃহ সংস্কার, আসবাবপত্রের খরচ এবং শিক্ষকদের বেতন দেবার দায়িত্ব নেন। শিক্ষার প্রতি অসীম অনুরাগ যেমন তাকে এই মহান কাজের স্বাভাবিক কান্ডারী করেছিল…. ঠিক তেমনই দেশের প্রতি অসীম ভালোবাসায় তিনি গান্ধীজীর পদাঙ্ক অনুসরণ করে অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন।
এখানে আরো যে দুজনের কথা না বললে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যাবে তাদের একজন শ্রী আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ও শ্রী বামাচরণ ঘোষ। বালির বাসিন্দা আশুতোষ বাবু অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং তৎকালীন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নে এমএসসি তে ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হন। তিনি এই বিদ্যালয়ে ক্রীড়া শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং বালিতে বয়েজ স্কাউট আন্দোলন কে কাজে লাগিয়ে তরুণ সংঘ গড়ে তোলেন। তার নামানুসারে 1938 সালে বিদ্যালয়ের আশুতোষ ভবনটি নির্মিত হয়।
নিজে নিরক্ষর হয়েও নিজের জীবনের সঞ্চয় এবং চাকরি থেকে পাওয়া অর্থের সিংহভাগ বিদ্যালয়কে দান করেছিলেন যে মানুষটি তিনি শ্রী বামাচরণ ঘোষ। পেশায় রেলের কর্মচারী হলেও তার মূল নেশা ছিল জনকল্যাণ। তারই অর্থে বিদ্যালয়ের একটি বড় অংশ গঠিত হয়। এই মানব দরদী মানুষটি নামে বিদ্যালয়ের একটি ভবন 'বামাচরণ ভবন' নামাঙ্কিত হয়ে আছে। শুভ চিন্তায় যে একমাত্র শুভ কাজের সূচনা ঘটাতে পারে তা বামাচরণ বাবুর কর্মোদ্যোগ থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জন্ম বড় না কর্ম বড় এ বিতর্কের কোন শেষ নাই। তবে এ কথা ঠিক যে কর্মের মধ্য দিয়েই জন্মের মূল চরিতার্থতার উপলব্ধি ঘটে।
বালি জোড়া অশ্বত্থতলা বিদ্যালয় তার জন্ম ক্ষণ থেকেই যেমন অঞ্চলের মানুষের সৎ উদ্যোগ ও সত্যনিষ্ঠ উৎসাহের সাহচর্য লাভ করেছে, ঠিক তেমনই তার কর্মের এই শতাধিক বছর অঞ্চলের মানুষের পূর্ণ সহযোগিতা, শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নিরলস পরিশ্রম ও শিক্ষার্থীদের অসীম ভালোবাসা তাকে আজও এগিয়ে নিয়ে চলেছে উন্নততর ভবিষ্যতের লক্ষ্যে।