
অন্ধকারের বুকের মাঝে
নিত্য আলোর আসন আছে
সেথায় তোমার দুয়ারখানি খোলো।
বেলেঘাটায় দারিদ্র্যক্লিষ্ট জীবনে, নতুন বিশ্বে সময়ের সঙ্গে লড়াই করে অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠার পথ দেখাতে ও সমাজকে চেতনা সমৃদ্ধ করার কাজে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালানোর কাজ শুরু করেছিলেন এক মহামানব। বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক রেবতীভূষণ ভৌমিক। তাঁর উদ্যোগে ১৯৩২ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাইস্কুল।
এই সুমহান ব্যক্তিত্ব তাঁর স্বকীয়তা, নিষ্ঠা ও নিরলস পরিশ্রম দিয়ে অনেক পরিবর্তনের ধারা বেয়ে স্রোতস্বতী এই বিদ্যালয়কে স্থাপন করেন সার্থকতার সাগর সঙ্গমে।
তাঁর পর আর এক অনন্যসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও অক্ষয় মনুষ্যত্বের অধিকারী ব্যক্তিত্ব মনোরঞ্জন রায়ের হাত ধরে বিদ্যালয় ক্ষুদ্র চারাগাছ থেকে মহিরুহের আকার ধারণ করে।
১৯৪৮ সালে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশনের তৎকালীন মেয়র ও রাজ্য মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য হেমচন্দ্র নস্কর বিদ্যালয়ের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি লক্ষ করে ১০ কাটা জমি দান করেন। সে সময়েই বিদ্যালয় তার পূর্ব অবস্থান থেকে চিরস্থায়ী ভাবে চলে আসে ৬৯ সি অবিনাশ চন্দ্র ব্যানার্জি লেনের বর্তমান ঠিকানায়।
যুগে যুগে সমাজ জীবনে এসেছে কালো আঁধারের রাত। কেটেও গেছে সে অমানিশার কাল। কবির কথায় "If winter comes can spring be far behind?" ১৯৭০ সালে এক অদ্ভুত ধ্বংসাত্মক রাজনীতির শিকার হয়ে অগ্নিসংযোগে ভস্মীভূত হয় এ বিদ্যালয়। বন্ধ হয়ে যায় ।
সেই অন্ধকারময় দিনগুলিকে পিছনে ফেলে বিদ্যালয়কে পুনরায় স্বমহিমায় ফিরিয়ে আনেন যে সন্ন্যাসীসম প্রধানশিক্ষক, তিনি মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
শুরু থেকেই এ বিদ্যালয়ের প্রধান সম্পদ এর নিষ্ঠাবান অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী। প্রাক্তন বহু ছাত্রই সেই নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকদের আনতমস্তক শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে।
অতীতের সেই ঐতিহ্যর স্পর্শ নিয়ে বর্তমান যুগের ভাবধারাকে মননের কোঠায় স্থাপন করে, ভাবীকালকে অতীতকালের প্রণম্য সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে এক নবীন ও সহনীয় উত্তরাধিকার তৈরি করার কঠিন লড়াইয়ে ব্রতী আমরা।
৮৯ বছর পরেও জীর্ণজরাকে জয় করে নবযৌবনের দূত হয়ে আজও তার অস্তিত্ব সগৌরবে বহমান। প্রবহমান সময় এভাবেই অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে বিম্বিত করে নানাভাবে।
সোশ্যাল মিডিয়া ও স্যাটেলাইট টিভিকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত জীবন বদলে গেছে। বদলে গেছে বেলেঘাটাও। মধ্যবিত্ত এখন মধ্যচিত্ত। সে এখন জীবন্ত ফসিলকে চ্যানেলে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দৃশ্যরূপে নিয়ে আসে, যা মন ও মননশীলতার রূপকল্পনার আবাসনকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তবু থামে না বিস্ময়কর জীবনবেগ।
হেমন্ত ঋতুর রিক্ততার মতো আপন কল্পনাজাত মননে যখন ধ্বংস সুখ-স্বর্গের আবেশ, তখনই স্নিগ্ধ শব্দের নন্দনকাননে শব্দ কৃষকের শব্দ বৃক্ষের ও সমুদ্র রাঙা সাহিত্য ও বিজ্ঞান মহিরুহের ছায়াময় আলে বসে এই বিদ্যালয় নিঃশব্দে, নিরলসভাবে মানুষ তৈরির কাজে প্রবহমাণ।
দাও দাও মোদের গৌরব দাও
দুঃসাধ্যের নিমন্ত্রণে
দুঃসহ দুঃখের গর্বে।
মস্তক তুলিতে দাও
অনন্ত আকাশে,
উদাত্ত আলোকে,
মুক্তির বাতাসে।