মাননীয় অভিভাবক, শিক্ষক, শিক্ষিকা, শিক্ষাসহায়ক কর্মী এবং স্নেহের শিক্ষার্থীরা,
সন ১৯৪৫। ভারতের ইতিহাসের আগুনঝরা দিন। স্বাধীনতার সূর্য ওঠার প্রাকমুহূর্ত। সূর্য ওঠবার আগে যেমন রক্তিম আকাশ, তেমনি রক্তিম হয়ে উঠেছে ভারতীয় সমাজের প্রায় প্রতিটি কোণ। বঞ্চনা আর বৈষম্যের বিষ ঘনীভবনের ফলে চরম সান্দ্র। বিদ্রোহ আর বিপ্লবের তুমুল ঝড়ে ব্রিটিশ নৌকো টালমাটাল। ভারতের মাটি বীরের জন্ম দেয়। ক্ষুদিরাম, প্রফুল্ল চাকী, বিনয় বাদল দীনেশরা আদর্শ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্রসমাজের শিরা উপশিরায়। ছাত্রসমাজ গর্জে ওঠে। ‘স্পর্ধায় চায় মাথা তোলবার ঝুঁকি’। কৈশোরের-তারুণ্যের তাজা রক্ত পরাধীনতার শিকল ভাঙতে তো চাইবেই। তাই সংগঠিত মিছিল আন্দোলন গড়ে তোলে ছাত্রদল। রাজশক্তি তা মানবেন কেন? ভেঙে গুঁড়িয়ে সমূলে বিনাশ করতে রাষ্ট্রযন্ত্র প্রয়োগ করেন। কিন্তু ‘ভয় কি মরণে রাখিতে সন্তানে মাতঙ্গী মেতেছে আজ সমর রঙ্গে’!
২১শে নভেম্বর, ১৯৪৫। ভবানীপুর। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়ে ছাত্রমিছিল এগিয়ে চলে ডালহাউসির দিকে। সংরক্ষিত স্থানে পৌঁছে আইন অমান্য করে মিছিল। শুরু হয় ব্রিটিশ পুলিশের দমন পীড়ন। শেষ পর্যন্ত গুলি চলে। রাজপথ রক্তে রাঙা। লুটিয়ে আছে ভারত মায়ের বীর সন্তান শহীদ রামেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায়! মাত্র ১৯ বছরের তরতাজা প্রাণ!
এমনই বহু আত্মবলিদানে পরাধীনতার মেঘ কেটে স্বাধীনতার সূর্যোদয়। কিন্তু চাঁদের গায়ের দাগের মত গভির ক্ষত এঁকে যায় দেশভাগ। গন্ডীর বিভ্রান্তি ক্রমশঃ গ্রাস করে বিভিন্ন অঞ্চল। বাঁধভাঙা জলের মত অধুনা বাংলাদেশ, তখনকার পূর্ব পাকিস্তান, থেকে আসতে থাকেন ছিন্নমূল মানুষেরা। ছেঁড়া শিকড়ে ফের মাটি দেওয়ার লড়াই তাদের। গড়ে ওঠে অজস্র উদ্বাস্তু কলোনী। দমদমের অমরপল্লীও তেমনি এক আবাসভূমি।
বাঁচা মানে তো কেবল শ্বাস নেওয়া নয়। বাঁচার মত বাঁচতে হলে শিক্ষা চাই। সেই তাগিদ কেবলই অনুভব করেন অমরপল্লীর প্রাণপুরুষ শিক্ষানুরাগী স্বর্গীয় জীবন কুমার মজুমদার। সেই তাগিদেই ১৯৫০ সালে অমর শহীদের নামে প্রতিষ্ঠা করেন শহীদ রামেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যামন্দির। সঠিক কাজে কোনো বাধাই তো বাধা নয়! কাজেই তাঁর এই বিদ্যালয় ক্রমোন্নতির শিখরে ওঠার প্রথম ধাপ ছুঁয়ে ফেলে ১৯৫৩ তে। গভর্নমেন্ট স্পনসর্ড ফ্রি প্রাইমারি রূপে অনুমোদিত হয় শহীদ রামেশ্বর প্রাথমিক বিদ্যামন্দির।
কিন্তু প্রাথমিক শিক্ষায় তো থামলে চলবে না। কাজেই ১৯৫৪ সালের ৭ই জানুয়ারী পঞ্চম-নবম শ্রেণিতে ৯২ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের। ক্রমশঃ তাঁর যোগ্য সহযোগী হয়ে ওঠেন আর এক উদ্যোগী তরুণ। সকলের শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় রবীন্দ্রনাথ দে। তারপর ক্রম সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে ১৯৫৭ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সরকারী অনুমোদন মেলে। ১৯৫৯ এ মেলে সহশিক্ষামূলক দশম শ্রেণি পর্যন্ত অনুমোদন। শিক্ষার্থী সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ১৯৬২ তে বালিকা বিদ্যামন্দিরের পৃথক অনুমোদন হয়। এরপর ১৯৬৩ তে একাদশ শ্রেণি সমন্বিত উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রূপে অনুমোদিত হয় এই বিদ্যামন্দির।
১৯৫৪ থেকে ২০০০ পর্যন্ত বিদ্যামন্দিরের হাল ধরে ছিলেন পরম শ্রদ্ধেয় স্বর্গীয় রবীন্দ্রনাথ দে মহাশয়। যে অগ্রগমনের ধারা তিনি সঞ্চারিত করেছিলেন বিদ্যামন্দিরের শিরা উপশিরায় আজও তা অব্যাহত।
বর্তমানে বিভিন্ন বিষয় সমন্বিত কলা- বিজ্ঞান- বাণিজ্য বিভাগে (সহশিক্ষামূলক একাদশ-দ্বাদশ) পাঠদানের পাশাপাশি দশম শ্রেণি পর্যন্ত বালক বিভাগে পাঠদান চলে। উন্নত পরীক্ষাগারে হাতে কলমে শিক্ষার পাশাপাশি অডিও-ভিস্যুয়াল এইড ব্যবহারে শিক্ষাদান চলে পঞ্চম থেকে দ্বাদশ সমস্ত শ্রেণিতেই। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ, মূল্যবোধ, বাস্তবতার নিরিখে প্রশিক্ষিত শিক্ষক মহাশয়দের তত্ত্বাবধানে চলে কেরিয়ার কাউন্সেলিং। নিয়মিত পত্রিকা প্রকাশে যেমন সুকুমার মতি শিক্ষার্থীদের মৌলিক ভাবনা চিন্তায় প্রেরণাযোগানো হয়, তেমনি বিভিন্ন মনীষীর স্মরণানুষ্ঠানে, আন্তর্জাতিক দিবস পালনে, ক্যুইজ-বিতর্ক-মকপার্লামেন্ট-অঙ্কন-আবৃত্তি-সঙ্গীত ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠানের আধারে গড়ে তোলা হয় শিক্ষার্থীদের মনোভূমি- মূল্যবোধ। বার্ষিক ক্রীড়াপ্রতিযোগিতা বা আন্তঃস্কুল ফুটবল টুর্নামেন্ট যেমন সংগঠিত হয় তেমনি নিয়মিত চলে শিক্ষামূলক ভ্রমণ।
নির্মল ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে এই শিক্ষাভূমি ক্রমশঃ হয়ে উঠেছে অঞ্চলের অন্যতম প্রধান শিক্ষাঙ্গন। কৃতি অধ্যাপক, শিক্ষক, চিকিৎসক, অভিনেতা, ক্রীড়াবিদের জন্মভূমি এই শহীদ রামেশ্বর বিদ্যামন্দির তাঁর এই ক্ষুদ্র পরিসরেই শিক্ষা অমৃত বিস্তারে আজও অঙ্গীকারবদ্ধ।