From the Head Of Institution Desk

গোটা কয়েক শব্দবন্ধে বিদ্যালয়ের পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস তুলে ধরা অত্যন্ত দুরুহ ব্যাপার। তা সত্ত্বেও এই সুদীর্ঘ কালের পথ চলাটুকু অস্বীকার করতে পারবেন না কেউ। ১৯৭০ সালের ১লা জানুয়ারী নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসাবে এই প্রতিষ্ঠানের পথ চলা শুরু।১৯৭৪ সালে এটি স্বীকৃতি পায়। আর এ কাজে যারা এগিয়ে এসেছিলেন তাদের মধ্যে আব্দুল ওয়াহেদ সাহেব, আব্দুর রাজ্জাক সাহেব, পরিতোষ  মজুমদার, নিয়ামত খলিফা, কাবাতুল্লা সেখ, বিজন কুমার সরকার প্রমুখ ব্যক্তি এবং এতদ অঞ্চলের শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা। বিদ্যালয়ের প্রধানশিক্ষক অশোক মজুমদার মহাশয় বিদ্যালয়ের একজন সংগঠক শিক্ষক যিনি এ বিদ্যালয়কে গড় তুলেছেন। সঙ্গে পেয়েছেন আব্দুল হামিদ সাহেব, মহম্মদ সেলিম সাহেব, মিনারুদ্দিন সাহেব, অরুন কুমার সরকার মহাশয়, কল্যান কুমার নাগ মহাশয়, সাজাহান সাহেব ও আশরাফুল সাহেবের মত গুণী মানুষদের যারা তাদের জীবনের বৃহদাংশ বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যয় করেছেন। তবে বিদ্যালয়ের এই জন্মলগ্নটা কুসুমাস্তীর্ণ ছিলনা। নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে বিদ্যালয় অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত নিম্ন মাধ্যমিকে পরিনত হয় ১৯৮৪ সালে। এরপর ২০০০ সালে এটি মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়।  এই সময়ের মধ্যে যারা বিদ্যালয়ের উন্নয়নে এগিয়ে এসেছেন তারা এতদ অঞ্চলের আপামর জনগণ। এখন বিদ্যালয় কলেবরে বেড়েছে। ছোট্ট বিদ্যালয়ের পরিসর বেড়ে তা বিপুলায়তন হয়েছে। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে। বিদ্যালয়ে কম্পিউটারের মাধ্যমে লেখাপড়ার ব্যবস্থা হয়েছে। গ্রথাগারের ব্যবস্থা হলেও গ্রন্থাগারিকের অভাব ও ছাত্রছাত্রীদের স্বল্পাগ্রহ রয়েছে।বিভিন্ন মডেল ও শিক্ষা সহায়ক বস্তু সামগ্রী থাকলেও ভাল মানের পরিক্ষাগারের অভাব রয়েছে। পানীয় জলের যথেষ্ট ব্যবস্থা হয়েছে । বিদ্যালয়ে সৌন্দর্য বাড়াতে বাগানের ব্যবস্থা করা গেছে। একটি স্থায়ী মঞ্চের খুবই প্রয়োজন ছিল। তবে এ ব্যাপারে প্রসাদপুর গ্রামপঞ্চায়েত সাহায্যের হাত বাড়িয়ে স্থায়ী মঞ্চ করার ব্যাপারে সদর্থক ভূমিকা নিয়েছে।পঞ্চায়েত পর্যায়ের প্রধান ও সমস্ত আধিকারিককে ধন্যবাদ।  বিদ্যালয়ে একটি সাইকেল গ্যারেজের ব্যবস্থা রয়েছে। মিড ডে মিলের ডাইনিং হলটিকে আরও উপযোগী করতে হবে। শিশু সংসদকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে। সবুজ বাহিনীকে সে ভাবে ব্যবহার করা এখনও হয়নি। সে বিষয়ে আরও দায়িত্ত্ব নিতে হবে। বিদ্যালয়ের মূল মাঠটি হুমায়ুন মঞ্জিলে হওয়ায় শরীর চর্চা বা অনুশীলনের জন্য দূরত্ব বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এটা অতিক্রম করতে হবে। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে কবাডি ও খো খো অনশীলন করা যায়। ভলিবল বা ব্যাডমিন্টন খেলার উপর জোর দিতে হবে। বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ক্রীড়াশিক্ষক মাধব কুমার পাল ও বর্তমান ক্রীড়াশিক্ষক চিন্ময় ঠাকুর খেলাধূলায় ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ ও অংশগ্রহনে উৎসাহিত করেছেন যা উল্লেখ না করলে সত্যের অপলাপ হবে। বিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠানে আজকাল অংশগ্রহণ করছে যেটা আশাপ্রদ। মাধ্যমিক পরীক্ষায় ছাত্রছাত্রীদের ফলাফল তেমন উল্লেখযোগ্য হচ্ছেনা। ফলাফল আরও ভাল করার জন্য আমাদের সচেষ্ট হতে হবে।বিদ্যালয়ের সঙ্গে অভিভাবকদের সতত যোগাযোগ ও নিজ সন্তানের অগ্রগতির নজরদারী আব্যশিক। অন্যান্য শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের  লেখাপড়ার মানও তেমন বাড়েনি। এ আক্ষেপ আমার থেকেই যাবে। তবে খেলাধুলার ক্ষেত্রে বিদ্যালয়ের বেশ কিছু ছাত্রছাত্রী জেলা, রাজ্য ও জাতীয় স্তরে বিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এটা বেশ সম্মানের ব্যাপার। বিদ্যালয়ের যে এলাকা সেটি মুসলিম ও অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির বাস । এদের আর্থিক অনটনের ফলে ছাত্রদের একটা বড় অংশ স্থানীয় আলমারী কারখানায় বা ইট ভাটায় কাজ করে। আর কিছু অংশ বাংলার বাইরে কাজে যায় । সারা বছরের উপস্থিতি ও একক মূল্যায়ন গুলিতে তার প্রতিফলন চোখে পড়ার মত। উচ্চ শ্রেণিগুলোতে ক্রমাগত ছাত্রীদের সংখ্যা কমে যাওয়া উদ্বেগের কারণ বইকি। সরকারী অনুদান পেতেও ছাত্রছাত্রীদের আগ্রহ যথেষ্ট কম। এ বিষয়ে আমাদের আরও যত্নবান হতে হবে।

এবারে আমার কথার শুরু। ২০১০ সালের ৪ঠা মে আমি এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়ে আসি।তখন প্রথম কাজ ছিল বিদ্যালয়ে একটি পরিচালন সমিতির ব্যবস্থা করা । পরিচালন সমিতি গঠিত হয় এবং তাতে বিদ্যালয়ের প্রাক্তনী রুহুল সাহেব সম্পাদক হিসাবে আসেন। এরপর আমাদের কাজ ছিল বিদ্যালয়ের আঙ্গিক পরিবর্তন । সে বিষয়ে কিছটা সফলতা আসে। একটি সাইকেল গ্যারেজ তৈরী করা সম্ভব হয়। বিদ্যালয়ের চার দিকে বেশকিছু শ্রেনিকক্ষ তৈরী হয় এবং বিদ্যালয়ের নিরাপত্তা কিছুটা হলেও নিশ্চিত হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ের নিরিখে সি সি টিভি বা ঐ জাতীয় নিরাপত্তা বলয়ের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে । আর্থিক সমস্যার ফলে তার বাস্তবায়ন কঠিন হয়েছে। আমরা আশাবাদী। এ সমস্যারও অচিরে সমাধান হবে। ছাত্রীদের জন্য বিদ্যালয় স্তরে সুস্বাস্থ্যাভ্যাস জরুরী। বিদ্যালয় সে বিষয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ও আধিকারিকদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেছে।

    এতো গেল ইট কাঠ পাথরের গল্প। শিক্ষার্থীর গল্প কোথায়? যাদের জন্য এই শিক্ষাঙ্গন তাদের কথায় বেশি করে বলতে হবে। তারাই আমাদের সম্বল । তাদের গড়ে তোলাই আমাদের কাজ। সে কাজে আমরা অতটা সফল কই? এই অস্থির সময়ের উদাসিনতা , গৃহশিক্ষকের প্রতি অতি আস্থা, বিদ্যালয়ে আসতে অনাগ্রহ আমাদের শিক্ষার্থীর মনোবল অতি লঘু করছেনাতো? উপলক্ষ্য থেকে আমরা কি দূরে সরে যাচ্ছি না? এ জিজ্ঞাসা আমার নিজের কাছেও। একজন শিক্ষক বা প্রধানশিক্ষক কি ভাবে একজন  করণিকে পরিনত হয় ? শ্রেণিতে পাঠদানের চাইতে প্রকল্প বা অনুদানের বাস্তবায়নে কি বিদ্যালয়ের সময়সুচি ব্যাহত হচ্ছেনা? কই সেভাবে তো কেউ বলছেন না। আমাদের কি ভাষা হারিয়ে গেছে? আসুন এই সুবর্ণজয়ন্তীর মহাভাগে আমরা শপথ নিই এক সুস্থ , সামাজিক , দায়বদ্ধ শিক্ষাব্যবস্থার।

    এই সময়ের মধ্যে অবসর গ্রহন করেছেন যারা, তাদের শারীরিক সুকল্যান কামনা করি। যারা প্রয়াত হয়েছেন তাদের বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি। কঠোর কঠিন বাস্তব জগত থেকে যে সমস্ত শিক্ষার্থীর প্রয়ান ঘটেছে তাদের আত্মারও শান্তি কামনা করি। আর যারা জীবন যুদ্ধে লড়াকু তাদের সাফল্য কামনা করি। সকলে বড় হোক।

    বিদ্যালয় মাধ্যমিক হয়েছে প্রায় দশ বছর। এরপর তার উচ্চমাধ্যমিকে রূপান্তর হওয়ার কথা। হল কই? কতগুলি বাধা নিষেধের চোরাপথে তা থেমে যাচ্ছে বার বার। স্বল্প মেধার, মধ্য মেধার অভাবী পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের ঠোকর খেতে খেতে অন্যান্য বিদ্যালয়গুলিতে যেতে হচ্ছে। সরকারী আদেশে তাদের ভর্তি করা বাধ্যতামূলক তাই। নতুবা? আমরা অসহায়। কয়েক বারের আপ্রাণ চেষ্টার পর হাল ছেড়ে দিয়েছি নিজেরাই। এবার আরও একবার ভাবব।  

   মনে অনেক আশা ছিল। প্রতিকূলতা কম ছিলনা । এখন ক্রমহ্রাসমান ছাত্র ছাত্রীর সংখ্যা। বিদ্যালয়ের সারা বছরের খরচ জুগিয়ে পরিকাঠামোগত উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। আধুনিক শ্রেনিকক্ষ গঠন সেখানে অলীক কল্পনা । কিন্তু তার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। সে ব্যাপারে বিদ্যালয় শিক্ষা দপ্তরেরও ভূমিকা আছে। দৃশ্য শ্রাব্য উপকরণের মাধ্যমে পাঠদানের ব্যবস্থা তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। বেশি বেশি করে তা বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছে দিতে হবে। সে জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপন তৈরী করতে হবে।

   এই সময়ে আমাদের কাছে এখন মস্ত বড় চ্যালেঞ্জ – ছাত্রশিক্ষক সম্পর্কের উন্নতি। যত দিন যাচ্ছে তত সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। একে পরিমার্জন করতে হবে। শিক্ষক আরও দায়িত্বশীল হোক, শিক্ষার্থী আরও সংবেদনশীল হোক। শ্রদ্ধাবান লভতে জ্ঞানম। সেই শ্রদ্ধাবোধের জায়গা থেকে আমরা কিছুটা সরে এসেছি বইকি। ঘরে বাইরে আমাদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হোক – এ কামনা রইল।  

এই সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব উদযাপনে যে সমস্ত বর্তমান ছত্রছাত্রী, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, স্থানীয় লোকজন, অভিভাবক, আধিকারিক, শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর সহয়ায়তা পেয়েছি তাদের ধন্যবাদ। যারা অলক্ষ্যে থেকেও আমাদের প্রতিনিয়ত সাহায্য করেছেন ও পরামর্শ দিয়েছেন তাদেরও অসংখ্য ধন্যবাদ। পরিশেষে একটা কথায়ই বলব -

“এ জন্মের গোধূলির ধূসর প্রহরে

বিশ্বরস-সরোবরে

শেষ বার ভরিব হৃদয় মন দেহ

দূর করি সর্ব কর্ম , সব তর্ক সকল সন্দেহ,

সব খ্যাতি সকল দুরাশা,

বলে যাব, আমি যাই, রেখে যাই, মোর ভালোবাসা।”