

‘মানুষের মধ্যে যে দেবত্ব প্রথম থেকেই আছে তার বিকাশই ধর্ম’ – স্বামী বিবেকানন্দের এই অমোঘ বাণীর প্রতি শ্রদ্ধা ও বিশ্বাস রেখেই আমরা, যারা মানুষ গড়ার কারিগর – তারা এগিয়ে চলেছি বিদ্যালায়ের শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীন বিকাশ সাধনে।
স্বামীজী আরো বলেছেন – ‘Education is the manifestation of perfection already in man.’ শিক্ষা হল মানুষের অন্তর্নিহিত পূর্ণতার প্রকাশ। ব্যাপক অর্থে শিক্ষা হল মানুষের শৈশব থেকে পরিণতির কাল পর্যন্ত বিকাশের নিরবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া। বিদ্যালয়ের শিক্ষাদান এই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ।
পঞ্চম শ্রেণিতে যে বালিকাটি ভর্তি হয়; সে ধীরে ধীরে উত্তীর্ণ হতে হতে যখন মাধমিক উত্তীর্ণা, তখন সে কিশোরী। তাই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই সময়কালে তার শারীরিক ও মানসিক বিকাশের দিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। এই সামগ্রিক বিকাশের মধ্যে আছেঃ-
♦ শিক্ষার্থীদের সমাজের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, প্রথা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত করানো এবং তা রক্ষা করতে শেখানো
♦ শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত আদর্শ গড়ে তোলা যাতে সামাজিক আদর্শের সাথে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়
♦ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযোগিতামূলক মনোভাব ও সহানুভুতিশীল সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে তোলা
♦ সমাজে নির্দিষ্ট বৃত্তি গ্রহণের মাধ্যমে নিজেকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার মানসিকতার ভিত স্থাপন করা
আমরা প্রত্যেকে সম্মিলিতভাবে বিভিন্ন উপায়ে শিক্ষার্থীদের সর্বাঙ্গীন বিকাশের জন্য সারা বছর নিয়োজিত। আমাদের প্রচেষ্টাগুলি নিম্নরূপঃ-
► পঠনপাঠনের উন্নতিকল্পে, পাঠদানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে ও পিছিয়ে পড়া ছাত্রীদের এগিয়ে নিয়ে যেতে নিয়মিত ভাবে বিভিন্ন Teaching aids এর সাহায্যে Smart Class, Special Class ও Project করানো।
► শিক্ষার্থীদের আধুনিক প্রযুক্তিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করার জন্য 2016 সাল থেকে ICT Computer Training দেওয়া হচ্ছে।
► প্রতিবছর ডিসেম্বর ও জানুয়ারী দুইমাস ব্যাপী অভিজ্ঞ শিক্ষিকারা Intensive Class Teaching এর মাধ্যমে দশম শ্রেণির ছাত্রীদের মাধ্যমিক পরীক্ষার উপযুক্ত করে তোলেন।
► স্বাস্থের বিকাশ ও চরিত্রগঠনে খেলাধূলার অবদান অনস্বীকার্য, তাই পঠনপাঠনের পাশাপাশি সারাবছর ব্যায়াম, পিটি, প্যারেড, ব্রতচারী করানো হয়। প্রতিবছর জানুয়ারী মাসে বাৎসরিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়।
► সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন দিবস পালনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ, একতা, নিষ্ঠা, ভ্রাতৃ্ত্ববোধ ইত্যাদি বিকাশের পাশাপাশি নৃ্ত্য – গীত – অঙ্কন – বিতর্ক - নাটক প্রভৃতিতে পারদর্শী করে তোলার জন্য নিরলস প্রচেষ্টায় শিক্ষিকারা নিবেদিত।
► নবম ও দশম শ্রেণির নির্বাচিত ছাত্রীদের নিয়ে ‘Child Cabinet’ গঠন করে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে বিকশিত হয় “দায়িত্ববোধ”।
► ‘Mock Parliament’ – এর আয়োজন করা হয় যাতে শিক্ষার্থীরা সুনাগরিক হবার সাথে সাথে রাজনৈতিক সচেতন হয়ে, প্রয়োজনে নে্তৃত্বদানে সক্ষম হয়ে ওঠে।
► শিক্ষার্থীদের পরিবেশ ও সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বিভিন্ন বিষয়ে যেমন বৃক্ষরোপন, জল অপচয়, সাফাই অভিযান, ঋতুচক্রের স্বাস্থ্যবিধি, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট, শিশুশ্রম, লিঙ্গ-বৈষম্য, ডেঙ্গু সচেতনতা, কন্যা সন্তানের সামাজিক সমস্যা ও আত্মরক্ষার উপর আলোচনা সভা, তাৎক্ষনিক বক্তৃতা, Rally ইত্যাদির আয়োজন করা হয়।
► সর্বশিক্ষা মিশনের সহায়তায় ছাত্রীদের Self-defence Program এ নিজেদের রক্ষা করার জন্য ক্যারাটে প্রশিক্ষন দেওয়া হয়।
► সর্বশিক্ষা মিশনের সহায়তায় ছাত্রীদের শিক্ষামূলক ভ্রমণে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।
বিভিন্ন সরকারী প্রকল্পগুলি আমরা বিশেষভাবে রূপায়নের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সহায়ক হওয়ার চেষ্টা করি। প্রকল্পগুলি হলঃ-
1. শিক্ষাবর্ষের সূচনায় ২রা জানুয়ারী প্রতি বছর “Book Day” পালনের মাধ্যমে বিনামূল্যে সরকারী বই প্রদান করা।
2. বিনামূল্যে সরকারী সহায়তায় খাতা, ব্যাগ ও ডাইরী দেওয়া।
3. পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের দুই সেট করে বিদ্যালয়ের নির্ধারিত পোষাক দেওয়া।
4. পঞ্চম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত Mid-day-meal এ পুষ্টিকর খাবার সমভাবে বন্টন করা।
5. নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সবুজসাথী সাইকেল দেওয়া।
6. কন্যাশ্রী, শিক্ষাশ্রী (for backward class), ঐক্যশ্রী (for minority) ভাতা সময়মতো প্রদান করা।
এইভাবে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে ফলপ্রসূ করার পাশাপাশি নানারকম ইতিবাচক ও গঠনমূলক প্রকল্প গ্রহণের মাধ্যমে আমাদের বিদ্যালয়ের উদ্যোগী শিক্ষিকাগণ ‘মানুষ’ গড়ার লক্ষ্যে এগিয়ে চলেছেন।
শিক্ষার উদ্দেশ্য জীবনের উদ্দেশ্যর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ করতে আমরা বদ্ধপরকর। ছোট্ট ছোট্ট মেয়েদের জীবনে এগিয়ে চলার পথে আসতে পারে নানা সংশয়, নানা প্রশ্ন, নানা জিজ্ঞাসা – সেগুলি অতিক্রম করে যাতে তারা সমাধানের পথ খুঁজে পায় – সে চেষ্টায় আমরা রত।
“Life is nothing but sum total of innumerable contradictions” – একথা মাথায় রেখেই শিক্ষার্থীদের সঠিক লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আছে আমাদের একঝাঁক তরুণী – কর্মদ্যোগী – নিবেদিত প্রাণ শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীবৃন্দ । আর এমন মহৎ উদ্দেশ্যের লক্ষ্যে যে বিদ্যালয় এগিয়ে যাচ্ছে, সেই বিদ্যালয়ের প্রধান হিসেবে আমি গর্বিত – আশান্বিত – আনন্দিত। আমরা মনে রাখি, শিক্ষার উদ্দেশ্য জীবনবিকাশ আর জীবনের উদ্দেশ্য সুষম শিক্ষা।
শবরী গুহ