History

দেশভাগের ফলশ্রুতিতে সর্বস্ব হারানো বাস্তুচ্যুত মানুষ পূর্ববঙ্গ থেকে পাড়ি দিয়েছিলেন এ বঙ্গে। সে সময় মুর্শিদাবাদের কাশিমবাজার লাগোয়া অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন ভিটেমাটি হারানো লোকজন। তৎকালীন কাশিমবাজারের রাজা মণীন্দ্রচন্দ্র নন্দীর আনুকূল্যে গড়ে ওঠায় এলাকাটি ‘মণীন্দ্রনগর’ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই অঞ্চলে নারীশিক্ষার প্রসারে তৎকালীন কিছু বিদ্যোৎসাহী, মহানুভব ব্যক্তি স্বতোঃপ্রণোদিত হয়ে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। ১৯৫৫ সালের ১৫ অগস্ট গড়ে তোলেন মণীন্দ্রনগর বালিকা বিদ্যালয়। সে সময়ের জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়, আজ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে(উচ্চ মাধ্যমিক) উন্নীত হয়েছে।

প্রথম দিকে মণীন্দ্রনগর বয়েজ স্কুলে এই বিদ্যালয়ের পঠন পাঠন চলতো। ১৯৫৫ সালে বিদ্যালয় ভবন তৈরির জন্য এলাকার শিক্ষাব্রতী লোকজন ভিক্ষা করে, স্থানীয়দের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে বর্তমান স্কুল বাড়ি তৈরি করেন। বিদ্যালয় ভবন তৈরি হলে ছেলেদের স্কুল থেকে এখানে বিদ্যালয়টি স্থানান্তরিত হয়। সকলের প্রিয় ‘মাস্টারমশাই’ নরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী এই বিদ্যালয়কে পুষ্ট করেছেন। এমনকি তাঁর বেতনের অর্থ তিনি বিদ্যালয়ের উন্নতিকল্পে দান করেছেন। তাঁরই অপর ছায়াসঙ্গী ছিলেন গিরীশচন্দ্র ভট্টাচার্য। আর্থিক সক্ষমতার যথেষ্ট অভাব থাকা সত্বেও এই নিঃস্বার্থ শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে পূর্ণ মাত্রায় উদ্যম ও উৎসাহ নিয়োগ করেছিলেন। বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্রী সংগ্রহ করা থেকে নারীশিক্ষায় এগিয়ে আসেন নরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যায় আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিদ্যালয়কে এগিয়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করেন মোহনলাল জৈন।  বিদ্যালয় পরিচালন সমিতির প্রথম সম্পাদক নগেন্দ্রনাথ দেব বিদ্যালয়ের উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিলেন। প্রভাত রায়চৌধুরীর হাত ধরে বিদ্যালয়ে স্টুডেন্টস হেলথ হোমের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল।

স্থানীয়রা জানান, বসতি স্থাপনের আগে পর্যন্ত মণীন্দ্রনগর আম বাগানে ভর্তি ছিল। সে সময় এলাকায় রোজগারের সংস্থান ভাল ছিলনা। এলাকায় একটি কাপড়ের মিল ছিল। সেখানে বেশ কিছু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছিল। এছাড়া ঝিনুকের বোতাম তৈরির কুটির শিল্প ছিল। তাতেও কিছু লোক কাজ করতেন। সরকারি চাকুরে বা স্কুল শিক্ষক ছিল হাতে গোনা। তখন মণীন্দ্রনগর ও তৎসন্নিহিত এলাকায় পাট চাষ হত। সে সময় উত্তরপ্রদেশ ও গুজরাত থেকে মাড়োয়ারি ও গুজরাতিরা এসে পাট কেনার কাজ শুরু করেন। পাট কেনার বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে মণীন্দ্রনগর। এলাকার শিক্ষিত লোকজন নারীশিক্ষার প্রসারে এগিয়ে আসেন নরেশচন্দ্র রায়চৌধুরী, গিরীশচন্দ্র ভট্টাচার্য, বিমল চক্রবর্তী, পরিমল সরকার, রাখালচন্দ্র শাসমল, শৈলেশ রায়, বিজয়কান্ত লাহিড়ী, ভূপেন্দ্রনাথ বসু, নগেন্দ্রনাথ দেবসহ অনেকেই। তাঁরা পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষা করে তিল তিল করে গড়ে তোলেন বিদ্যালয়ের ভবন।

বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক নরেশ রায়চৌধুরীর অবদান আজও কেউ ভুলতে পারেননি। কতিপয় ব্যক্তি বিনা পারিশ্রমিকে শিক্ষাদান করে গিয়েছেন, যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন গিরীন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য। ১৯৫৫ সালে প্রথমে জুনিয়র বালিকা বিদ্যালয়ের অনুমোদন লাভ করে এই বিদ্যালয়টি। ১৯৫৯ সালে বিদ্যালয়টি উচ্চ বিদ্যালয়ের অনুমোদন পায়। সে সময় সরকারি অনুদান কিছুই পাওয়া যেতনা। ছাত্রীদের কাছ থেকে দু’এক টাকা বেতন নেওয়া হতো। তবে শিক্ষকদের উপার্জনের সব অর্থ বিদ্যালয়ের ভবন তৈরির কাজে ব্যয় করতেন। ১৯৬০ সালে বিদ্যালয়টি সরকারি সাহায্যের অনুমোদন পায়। তখন থেকে শিক্ষক-শিক্ষিকারা সামান্য বেতন পেতে থাকেন। নরেশ রায়চৌধুরীর মৃত্যুর পর বিদ্যালয়ে প্রথম প্রধান শিক্ষিকা হয়ে আসেন গৌরী চট্টোপাধ্যায়। এর পরে ধীরে ধীরে বিদ্যালয়ের কলেবর বাড়তে থাকে। ২০০৫ সালে রাজ্যসভার সদস্য মনোজ ভট্টাচার্য ও সর্বশিক্ষা মিশনের আর্থিক সহায়তায় নতুন ভবন গড়ে ওঠে। এসব সত্ত্বেও বিদ্যালয়ের যে ভবনটি প্রথম তৈরি হয়েছিল, সেটি আজ ভগ্ন অবস্থায় পড়ে আছে। ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টি উচ্চ মাধ্যমিকে উন্নীত হয়েছে।