সম্ভবত 1912 খ্রিস্টাব্দে, স্থানীয় বিদ্যানুরাগী ব্যক্তি মৌলানা সুলতান সাহেব হাওড়া জেলার সাঁকরাইল থানার অধীনস্থ দক্ষিণ সাঁকরাইল গ্রামে, এলাকার কিছু বিশিষ্ট শিক্ষাব্রতী মানুষদের সহায়তায় তৎকালীন বাসিন্দা লোকমান মিদ্দের টিনের দোকানে সামনের বারান্দায় এলাকার কিছু বালককে পাঠদানের জন্য অবৈতনিক ও অস্থায়ী পাঠশালা চালু করেছিলেন| যা প্রধানত: ছিল আরবি শিক্ষার মাদ্রাসা বা পাঠশালা| ওঁদের আন্তরিক উদ্বেগে গ্রামের আরো কিছু বিশিষ্ট মানুষের বিনীত অনুরোধে গ্রামের পশ্চিম পাড়ার বাসিন্দা জনাব ফজলে হক মোল্লা তাঁর কলাবাগান ও বিভিন্ন গাছে পরিপূর্ণ জমি থেকে খানিকটা পরিমাণ জমি দান করেন মাদ্রাসা গড়ার কাজে| পার্শ্ববর্তী মানিকপুর, সারেঙ্গা গ্রামের ইটভাটা থেকে ইট, টালি এবং গ্রামের অভিভাবকবৃন্দের বাগানের বাঁশ, এমনকি সাঁকরাইল বেলঘড়িয়া জুটমিল ভাঙ্গা পুরনো ইট-কাঠ অনুদান হিসেবে সংগ্রহ করে গ্রামের কয়েকজন শিক্ষানুরাগী যুবক সেদিন প্রাণপণ পরিশ্রম করে কাদা দিয়ে গেঁথে দক্ষিণ দিকে টালির ছাউনি দিয়ে হলঘর এবং উত্তর-পূর্ব দিকে প্রাচীর নির্মাণ করেন| পরবর্তীকালে এলাকার অগণিত শিক্ষাদরদি ব্যক্তিদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আন্তরিক চেষ্টায় 1930 সালে বিদ্যালয়টি সরকার অনুমোদিত সহশিক্ষা মূলক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে| 1954 সালের 18 ই মে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাওয়ায়, তাদের পঠন-পাঠনের সুবিধার জন্য ডোমজুড় কোর্টে বিদ্যালয়ের অনুকূলে তৎকালীন পরিচালন সমিতির প্রথম সম্পাদক গোলাম রসূল শেখের নামে প্রায় এক বিঘা জমি উইল করে তাঁর বিদ্যানুরাগ তথা মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন ফজলে হক মোল্লা সাহেব | নানা সমস্যা, বাধা বিঘ্নের মধ্যে দিয়েই বিদ্যালয়টি আজ তিলে তিলে তিলোত্তমায় পরিণত হয়েছে| দেখতে দেখতে সেই দিনের সেই ভূমিষ্ঠ শিশু পাঠশালা আজ আয়তনে বটবৃক্ষে পরিণত হয়েছে এবং চারপাশে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করছে |এ জন্য আমি এলাকাবাসী হিসাবে আনন্দিত|
যাই হোক স্বাধীনতার 73 বছর পেরিয়ে এসেও আমরা আজও আদর্শ মানুষ গঠনের উপযোগী নীতি শিক্ষা ও জীবন উপযোগি শিক্ষার মেলবন্ধন এগরা নতুন শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবে লাভ করিনি | এটা অত্যন্ত আক্ষেপ ও পরিতাপের বিষয় |ব্রিটিশ আমলের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিদ্রুপ করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “শিক্ষার হেরফের” প্রবন্ধ লিখেছিলেন –‘আমরা যতই বি.এ., এম.এ. পাস করিতেছি রাশি রাশি বই বুদ্ধিবৃত্তি তার তেমন বেশ বলিষ্ঠ এবং পরিপক্ক হইতেছে না, তেমন জোরের কিছু দাঁড় করাইতে পারিতেছি না...|’
অত্যন্ত দুর্ভাগ্যের বিষয় এই যে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্ক আজ অবলুপ্তির পথে| শিক্ষকতা যে পেশা নয়, পবিত্র ও মোহন ব্রত একথা আজকের দিনে শিক্ষকদের একাংশ বিস্মিত| বিপরীত দিকে শিক্ষক সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন প্রতিনিয়ত কমে যাচ্ছে| শিক্ষক মহাশয় দের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান বোধ জাগানোর দায়িত্ব যেমন ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি তাদের অভিভাবকবৃন্দেরও| শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা সম্মান প্রদর্শন না করে প্রকৃত শিক্ষা লাভ করা যায় কি ? যায় না|
শিক্ষা প্রাণের সম্পদ মন প্রাণ দিয়ে তাকে ভালোবাসতে না পারলে শিক্ষাগ্রহণ বিড়ম্বনা হয়ে দাঁড়ায় আজকের দিনের অর্থ লোলুপতা, স্বার্থপরতা, অপসংস্কৃতি, নানা সোশ্যাল মিডিয়া তথা গণমাধ্যম এর বিভিন্ন কুরুচিকর ফাঁদে পড়ে জীবনের মূল্যবোধ যখন নিম্নগামী কেরিয়ার সর্বস্বতার যুগে ছাত্র-ছাত্রীরা যখন দিগভ্রান্ত, বিপথগামী, তখন সেই মুহূর্তে তাদের সঠিক পথে নিয়ে আসার জন্য এই বিদ্যালয় তাদের কাছে ‘Friend, Philosopher, & Guide’ হয়ে উঠুক|
আজকের দিনের মূলমন্ত্র হোক প্রকৃত অসাম্প্রদায়িক মনোভাব ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি সহ ছাত্র-ছাত্রী তথা ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ে তোলা| বিদ্যালয় ভবনটির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে পঠন-পাঠনের উপযুক্ত পরিবেশ ও পরিকাঠামো তৈরি করে পরীক্ষা ব্যবস্থা ও মূল্যায়নের গতি সচল রাখতে, শিক্ষ উপকরণের সুষ্ঠু সরবরাহে, গ্রন্থাগার নির্মাণ করতে, যথাযথ ক্রীড়া সংগঠন ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে সমৃদ্ধ করতে স্থানীয় সকল অভিভাবকবৃন্দের কাছে অকৃপণ সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবার জন্য বিনীত অনুরোধ করছি| বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিতে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ও ধর্মনিরপেক্ষতার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে সকল ছাত্র-ছাত্রী অভিভাবকবৃন্দ শিক্ষক শিক্ষিকা শিক্ষাকর্মী গণ এবং সর্বস্তরের বিদ্যানুরাগী ব্যক্তিদের সক্রিয় সাহায্য প্রয়োজন একইসঙ্গে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ডাকা সভাগুলোতে উপস্থিত থেকে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার বিষয় ও বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে সুপরামর্শ দেবার জন্য স্থানীয় অভিভাবক ও অভিভাবিকাদের আন্তরিক মূল্যবান পরামর্শ সর্বদা স্বাগত|