History

রাজাপুর দক্ষিণ বাড়ি হাই স্কুল (উচ্চ মাধ্যমিক)-এর অনালোকিত ইতিহাস

“ যারে তুমি নীচে ফেল সে তোমারে বাঁধিবে যে নীচে

    পশ্চাতে রেখেছ যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে”

গীতাঞ্জলি/১০৮ সংখ্যক কবিতা ( হে মোর দুর্ভাগা দেশ )- শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ।।

সরকারি তথ্য থেকে একটি নির্জলা সত্য জানা যায় যে,ডোমজুড় ব্লকের উত্তর ঝাঁপড়দহ এবং রুদ্রপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রাজাপুর-দক্ষিনবাড়ি-চকহরি-মহিষনালা-মহিষগোট-জাব্দাপোতা সহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় সিংহভাগ বাসিন্দা তপশিলি জাতি সম্প্রদায় ভুক্ত ।এ কারণে এই অঞ্চলটি Schedule Belt হিসাবে সমধিক পরিচিত।সমাজের আপাত উন্নত-মার্জিত এবং শিক্ষিত মানুষের চোখে এরা আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া অনগ্রসর প্রান্তিক জনগণ বলে পরিগণিত।সুদীর্ঘ অতীত থেকে এই স্থানের মানুষজন খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানের জন্য লড়াই করে বেঁচে থাকলেও সন্তানের শিক্ষা সেখানে ছিল অবহেলিত অনালোকিত এবং বিলাসিতা মাত্র।।যদিও অতি সামান্য সংখ্যক সচেতন মা বাবা তাদের সন্তানদের ডোমজুড় ব্লকের কিছু বর্ধিষ্ণু স্কুলে শিক্ষা লাভের জন্য পাঠাতেন।আর তাই এই অঞ্চলের সিংহভাগ ছেলে মেয়েরা অশিক্ষার গহন অন্ধকারে ডুবে থাকে অনন্তকাল ধরে। শোষিত পীড়িত বঞ্চিত অবহেলিত শিশুদের মনে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালাতে এবং ‘মূঢ় ম্লান মূক মুখে’ভাষা দিতে এগিয়ে এলেন এতদ অঞ্চলের অগণিত মহানুভব শিক্ষানুরাগী মানুষজন।তাঁদের

নিরলস পরিশ্রম ও আন্দোলনে সাড়া দিয়ে পশ্চিম বঙ্গ সরকারের শিক্ষা দপ্তর ১লা মে ২০০৫ সালে জুনিয়র হাইস্কুল খোলার ছাড়পত্র দিলেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার প্রায় ষাট বছর পর এই অঞ্চলের ছেলে মেয়েরা আধুনিক শিক্ষা এবং জ্ঞানের আলো পাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পায়।   

 

হাওড়া-আমতা রোডের দক্ষিনবাড়ি বটতলা বাস স্টপের পাশে সরকারি ভূমি ‘ভাগাড়’ সংলগ্ন স্থান বরাবর দক্ষিনবাড়ি মৌজার দুই এবং আঠারো নম্বর দাগের ভূমিতে এই বিদ্যালয় নির্মিত হয়।এই অঞ্চলের ছেলে মেয়েদের শিক্ষার জন্য হাওড়া মল্লিক ফটকের বাসিন্দা মহানুভব ব্যক্তি শ্রী হৃষীকেশ ভট্টাচায মহাশয় স্বেছায় এই ভূমি দান করেন।তৎকালীন অ্যাড হক কমিটির তত্ত্বাবধানে সরকারি অনুদানে মাত্র দু’টি হল ঘর নির্মিত হয়।শুরুতে শত সমস্যা আর অভাবের মধ্যেই  ২০০৬ শিক্ষাবর্ষে এস এস সির সুপারিশ মোতাবেক চার জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং স্থানীয় শিক্ষানুরাগী স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিক সহযোগিতায় ২১৮(এর মধ্যে ২১৩ জন শিক্ষার্থী তপশিলি) জন শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রথাগত পঠন পাঠন শুরু করেন।সেই শুরু।তারপর ধীরে ধীরে এই বিদ্যালয় পত্র পুষ্প ফলে সুশোভিত বিশাল বটবৃক্ষ রূপে উন্নীত হতে পেরেছে।আর তা সম্ভব হয়েছে প্রত্যেকটি কমিটি ও অভিভাবকদের অকৃপণ সহযোগিতায়।সদ্য প্রয়াত শ্রদ্ধেয় শ্রী প্রভাত কুমার মণ্ডল প্রধান শিক্ষক হিসাবে ২০০৭ সালে এই নেই রাজ্যের উপত্যকায় এসে যোগ দেন।তাঁর সুযোগ্য নেতৃত্ব ,আন্তরিক কর্ম তৎপরতা এবং সহকর্মীদের ঐকান্তিক সহযোগিতায় এই শিক্ষাঙ্গন ২০১২ সালে মাধ্যমিক এবং ২০১৮ সালে উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রূপে উন্নীত হয়।শুধু তাই নয় জেলা স্তরে নির্মল বিদ্যালয় পুরষ্কার লাভ,ব্লক স্তরে বিজ্ঞান মেলায় সেরার স্বীকৃতি,কন্যাশ্রী পুরষ্কার লাভ,অঙ্কন ও প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার লাভ,মিড ডে মিল পরিষেবায় প্রশংসা লাভ এই বিদ্যালয়ের সামগ্রিক মর্যাদা বৃদ্ধিতে সাহায্য করেছে।এছাড়াও বিগত কয়েক বছর শিক্ষক–শিক্ষিকাদের ব্লক-জেলা স্তরে বহুমুখী কর্মশালায় প্রতিনিধিত্ব করায় এবং মাধ্যমিক পরীক্ষা কেন্দ্র হওয়ার জন্য ব্লকের মধ্যে এই বিদ্যালয় তার নিজস্ব গরিমায় আলাদা পরিচিতি লাভ করেছে।

 বর্তমানে এই বিদ্যালয়ে ১৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা,একজন শিক্ষা-কর্মী এবং ছ’জন মিড-ডে মিল কর্মী কর্মরত।এবং ৬১৬ জন শিক্ষার্থী পাঠরত।সরকারি অনুদানে পরিকাঠামোগত ভাবে এই বিদ্যাঙ্গন ডোমজুড় ব্লকের অন্যতম আদর্শ স্কুল (Model School) হয়ে ওঠার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে।গ্রন্থাগার,কম্পিউটার প্রশিক্ষণ,ভূমিদাতার নামে স্মৃতি পুরষ্কার,মুক্ত মঞ্চ নির্মাণ,নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যে নিজস্ব খেলার মাঠ, বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মতামত প্রকাশের মুখপত্র সাহিত্য পত্রিকা‘সৃজনী’ প্রকাশিত হয়।সমাজ কল্যাণের উদ্দেশ্যে গঠিত‘প্রাক্তন ছাত্র সম্মিলন’একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ।জাতীয়-সামাজিক-পরিবেশ সচেতনতা উৎসব পালিত হয়।মহামান্য মনিষীদের জন্ম-মৃত্যু শ্রদ্ধার সঙ্গে পালন ও স্মরণ করা ছাড়াও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

এই বিদ্যালয় থেকে বহু শিক্ষার্থী পাশ করে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সুনামের সঙ্গে কাজ করে চলেছে।অনেকেই বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ব বিদ্যালয়ে  পাঠরত।কেউ কেউ খেলায় জেলা-রাজ্য ও জাতীয় স্তরে নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছে। সমস্ত শ্রেণির পঠন পাঠনের পাশাপাশি ধারাবাহিক প্রগতি মূল্যায়ন ও বোর্ডের পরীক্ষার সন্তোষজনক ফল পেতে ছাত্র-শিক্ষক-সমিতি-অভিভাবক সম্পর্ক সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে আরও সুদৃঢ় ও আন্তরিক দায়বদ্ধ হওয়ার নিরলস চেষ্টা করেছে।এই বিদ্যালয় বহুমুখী কর্ম প্রবাহে তির্যক ভ্রূকুটি অতিক্রম করে স্বাবলম্বী হওয়ার স্পর্ধা দেখাতে চেষ্টা করেছে।যা ব্যতিক্রমী।