

গড়ে ওঠার কথা
(চলমান ইতিহাসের ধারায় ৫৯ বছর সময়টা খুব দীর্ঘতর কিছু না হলেও, একটি বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সময়টা খুব কমও নয়। বিদ্যালয়ের এই ক্রমবিকাশের কোনো ধারাবাহিক লিপিবদ্ধ তথ্য না থাকায় সবটাই তৎকালীন সংশ্লিষ্ট ব্যাক্তিগণের মৌখিক বিবৃতির উপর নির্ভর করে সংকলিত। তাই এই সংকলনে কোনো অসঙ্গতি ধরা পড়লে তা বিস্মৃতিজনিত ত্রুটি ও সংকলকের সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত। এ ক্ষেত্রে পাঠকমন্ডলীর উপর ও ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিই আমাদের পাথেয়।)
অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার তৎকালীন নন্দীগ্রাম-৩ থানার ব্রজলালচক মৌজায় এক প্রত্যন্ত ভূমিতে শ্যামসুন্দরপুর হাইস্কুলের আত্মপ্রকাশের বীজ অঙ্কুরিত হয় আজ থেকে ৫০ বছর আগে। শ্যামসুন্দরপুর গ্রামের বর্ধিষ্ণু মিশ্র পরিবারের ভূমির উপর প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি। ১৯৬২ সালের ২ জানুয়ারী বিদ্যালয়টি 2- Class Junior High School অর্থাৎ ৫ম ও ৬ষ্ঠ শ্রেণীর অনুমোদন পায়। , পরে ১৯৬৪ সালে 4- Class Junior High School হিসাবে সরকারী অনুমোদন লাভ করে। এটি দীর্ঘদিন নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়রূপে ছাত্র ছাত্রীদের শিক্ষা দানের কেন্দ্র হিসাবে চলতে থাকে। বিগত ০১.০৫.২০০৯ থেকে এটি সরকারী অনুমোদনে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পরিগণিত হয়।
কথিত আছে, এই স্থানটিতে বহুকাল আগে মিশ্র পরিবারের স্থাপিত হাট (মতির মা'র) বসত। এছাড়া সংলগ্ন বড় পুকুরে দক্ষিণ -পশ্চিম প্রান্তে ছিল স্থানীয় গ্রামবাসীদের শ্মশান ভূমি, যা আজও বিদ্যমান। উক্ত মিশ্র পরিবারের বিদ্বানুরাগী জমিদার স্বর্গীয় শিবনারায়ণ মিশ্র মহাশয়ের ভূমিতে পরবর্তীকালে ঐ পরিবারের অপর বিদ্বোৎসাহী জমিদার স্বর্গীয় সতীশচন্দ্র মিশ্র মহাশয়ের অনুকম্পায় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপিত হয়। ঐ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংলগ্ন ভূমিতেই ১৯৬১-৬২ সালে স্বর্গীয় সতীশচন্দ্রের শিক্ষিত, সুযোগ্য, বিদ্বানুরাগী পুত্র প্রয়াত অনিলকুমার মিশ্র মহাশয়ের তত্ত্বাবধানে ও কতিপয় স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী উদ্যমী ব্যাক্তিগণের একান্ত সহযোগীতায় প্রাণ- প্রতিষ্ঠা হয়েছিল এই নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যাতয়নের। তৎকালীন এলাকার বিধায়ক স্বর্গীয় সুবোধ চন্দ্র মাইতি, স্বাধীনতা সংগ্রামী প্রয়াত ভারতবিজয় মাইতি, শিক্ষাব্রতী প্রয়াত দেবনারায়ণ সাউ, প্রয়াত ডা: চিন্ময়কুমার গায়েন, প্রয়াত শশাঙ্কশেখর মাইতি, স্বর্গীয় হিমাংশুশেখর গুড়িয়া, স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন ঘোড়ই, স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন বেরা প্রমুখ এবং মিশ্র পরিবারের অন্যান্য শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিগণের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল নিরালা গ্রাম্য পরিবেশে এই বিদ্যাশিক্ষার কেন্দ্রটি।
দীর্ঘকাল ধরে এই বিদ্যালয়ের ধারক -বাহক ছিলেন স্বর্গীয় অনিলকুমার মিশ্র -সম্পাদক, স্বর্গীয় হিমাংশুশেখর গুড়িয়া -সভাপতি, স্বর্গীয় দেবনারায়ণ সাহু -বিদ্যোৎসাহী সদস্য হিসাবে। এঁদের নিরলস প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। পরবর্তীকালে স্বর্গীয় তারকনাথ মিশ্র, স্বর্গীয় বিশ্বনাথ মিশ্র, স্বর্গীয় একোনাথ মিশ্র মহাশয়গণ বিদ্যালয়কে ভূমি দান করায় এর কলেবর বেড়ে ওঠে। বিদ্যালয়টি এলাকার একটি সুপ্রতিষ্ঠিত নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়রূপে পরিগণিত হয়।
জন্মলগ্নে বিদ্যালয় প্রধান হিসাবে প্রয়াত চিত্তরঞ্জন বেরা কর্মভার গ্রহণ করেন। পরে চুনখাবাড়ী গ্রামের শ্রী স্বর্গীয় মোহিতমোহন জানা মহাশয় এর দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। অতঃপর বিদ্যালয়টি 4- Class Junior High School হিসাবে সরকারী অনুমোদন লাভ করার পর স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র জানা ও পরে স্বর্গীয় প্রতাপচন্দ্র সাহু প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব সহকারে তাঁদের কাজ চালিয়ে যান। এ সময় উপযুক্ত পরিচালকমন্ডলী ও বিদ্যালয়ের একনিষ্ঠ শিক্ষাব্রতী শিক্ষককুলের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার মান যথেষ্ট উন্নীত হওয়ায় পাশাপাশি ৬-৭ টি গ্রামের অধিবাসীবৃন্দ তাঁদের বাড়ির ছেলে-মেয়েদের এই বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণের জন্য পাঠাতে শুরু করেন।
১৯৬৭ থেকে ১৯৭৬ সালের মধ্যে কয়েকজন কৃতি ছাত্র ছাত্রী ৬ষ্ঠ ও ৮ম শ্রেণী তে স্কলারশিপ লাভ করে বিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করে। বিদ্যালয়টি তার আদর্শ রূপ পরিগ্রহ করতে থাকে। এই সময় বিদ্বোৎসাহী শ্রীখদ্যোতরঞ্জন মিশ্র মহাশয়ের ঐকান্তিক উদ্যোগে, প্রয়াত প্রফুল্ল পন্ডা (শিক্ষক) প্রমুখ বিদ্বানুরাগী ব্যক্তির সহায়তায় বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণীর পঠন পাঠন শুরু করা হয় মাধ্যমিকের অনুমোদনের প্রত্যাশায়। কিন্তু সরকারী অনুমোদন না পাওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়।
কালের গতি সবসময় সমান যায়না। প্রত্যেক বিষয়ের উত্থান পতন আছে। তাই বিদ্যালয়ের গৌরবময় দিনগুলি একসময় অভ্যন্তরীণ কিছু সমস্যার কারণে তার উজ্জ্বলতা হারাতে থাকে। পড়াশুনার মান কমতে থাকে, বিদ্যালয়টি পরিচালকহীন নৌকার মতো চলতে চলতে একসময় এর অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। ঐ দুর্দিনে তখনকার শিক্ষক -শিক্ষাকর্মীমন্ডলী বহু লড়াই করে বিদ্যালয়ের অস্তিত্ব বজায় রাখতে সক্ষম হয়। এই তমসাবৃত দিনগুলিতে তাঁরা বিদ্যালয়ের সমূহ পরিচালন ব্যয়ভার বহন করে বিদ্যালয়ের অবক্ষয়মোচনে ব্রতী হয়, কবির অমৃতবাণী অনুসরণে -
'ব্যাঘাত আসুক নব নব - আঘাত খেয়ে অচল রব,
বক্ষে আমার দুঃখ তব
বাজবে জয় ডঙ্ক।
দেব সকল শক্তি, লব অভয় তব শঙ্খ। '
কালক্রমে প্রশাসনিক অনুকম্পায় বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক শ্রী মনোজ কুমার মাইতি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত শিক্ষক হিসাবে বিদ্যালয়ের কার্যাদি সম্পাদনে ব্রতী হন। তাঁর অবসরের পর শ্রীনিমাইচরণ বারিক মহাশয় ভারপ্রাপ্ত শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঐ সময় বিদ্যালয়ের একটি পাকাগৃহ ও শৌচাগার নির্মিত হয়, অন্যান্য অসমাপ্ত কার্যাদি সম্পন্ন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হয়। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, এই সময়েই দীর্ঘ ২৬ বছর পরে বিদ্যালয়ের পরিচালকমন্ডলী পুনর্গঠিত ও অনুমোদিত হয়।
তাঁর অবসর গ্রহণের পর শ্রী ঝন্টুকুমার প্রধান মহাশয় দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এ সময় বিদ্যালয় ভবনের দ্বিতল, প্রধান শিক্ষক সহ অন্যান্য শিক্ষক -অশিক্ষক শূণ্যপদগুলি পর্যায়ক্রমে পরিপূর্ণতা লাভ করে। বর্তমান প্রধান শিক্ষক এই বিদ্যালয়ে যগদান করেন ২০০৭ সালে।
বিদ্যালয় আজ ৫৮ অতিক্রম করেছে। বেড়েছে, বাড়বে ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষক -শিক্ষাকর্মী সংখ্যা ও পরিকাঠামো। আজ শিক্ষার মনোন্নয়নে সদাব্রতী শিক্ষককুল, সাথে আছে অভিভাবক -অভিভাবিকা -গ্রামবাসীগণের ঐকান্তিক শুভকামনা, অনুপ্রেরণা।।
তাই প্রগতি.........।
( সংকলন- অরুণাংশু প্রধান, প্রধান শিক্ষক)
(তথ্যসূত্র- স্বর্গীয় ঈশ্বরচন্দ্র জানা, স্বর্গীয় মোহিতমোহন জানা , স্বর্গীয় হিমাংশুশেখর গুড়িয়া, স্বর্গীয় চিত্তরঞ্জন ঘোড়ই, শ্রী খদ্যোতরঞ্জন মিশ্র, শ্রী নিমাইচরণ বারিক প্রমুখ।)